লালমোহন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্যাথলজি বিভাগে প্রয়োজনীয় আধুনিক সরঞ্জাম ও লোকবল না থাকায় প্রতিনিয়ত চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে সেবাপ্রত্যাশী রোগীরা

মোঃ মাকসুদ আলম প্রকাশিত: ২৫ মার্চ , ২০২৫ ১১:১৯ আপডেট: ২৫ মার্চ , ২০২৫ ১১:১৯ এএম
লালমোহন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্যাথলজি বিভাগে প্রয়োজনীয় আধুনিক সরঞ্জাম ও লোকবল না থাকায় প্রতিনিয়ত চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে সেবাপ্রত্যাশী রোগীরা
ভোলার লালমোহন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্যাথলজি বিভাগে কেবল মাত্র একটি সেল কাউন্টারের অভাবে প্রতিনিয়ত চরম দুর্ভোগে পড়ছেন সেবাপ্রত্যাশী রোগীরা

ভোলার লালমোহন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্যাথলজি বিভাগে কেবল মাত্র একটি সেল কাউন্টারের অভাবে প্রতিনিয়ত চরম দুর্ভোগে পড়ছেন সেবাপ্রত্যাশী রোগীরা। এই আধুনিক যুগেও এনালগ পদ্ধতিতে রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে এই প্যাথলজি বিভাগটিতে।
প্যাথলজি বিভাগে অণুবীক্ষণযন্ত্রের দ্বারা চোখে দেখে রক্ত কণিকা নির্ণয় করা হয়, যা অত্যন্ত সময় সাপেক্ষ। যার ফলে বর্তমানে কেবল ৭ থেকে ৮ জন রোগীই দৈনিক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্যাথলজি বিভাগ থেকে কম মূল্য সেবার নেয়ার সুযোগ পান। আর সেখানে সেবা নিতে গিয়ে ফিরে যাওয়া রোগীরা বাইরের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকে উচ্চমূল্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে বাধ্য হচ্ছেন।
যদিও লালমোহন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্যাথলজি বিভাগে দায়িত্বরত ব্যক্তিরা বলছেন, বর্তমানে প্যাথলজি বিভাগে অন্তত ২০টি সেবা চলমান রয়েছে। এই সেবা থেকে গড়ে প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকার মতো রাজস্ব আদায় হচ্ছে। তবে আধুনিক এই সময়েও প্যাথলজি বিভাগটিতে এনালগ পদ্ধতিতে কার্যক্রম চলায় কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট (সিবিসি) পরীক্ষা করাতে ব্যাপক হিমশিম খাচ্ছেন কর্তব্যরতরা। আবার এই বিভাগটিতে পর্যাপ্ত লোকবলেরও সংকট। এখানে ৩ জন টেকনোলজিস্টের পদ থাকলেও আছেন কেবল একজন। আর ল্যাব অ্যাটেনডেন্টের পদটি শূন্য।
সরেজমিন গত কয়েকদিন ধরে লালমোহন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্যাথলজি বিভাগের কার্যক্রম পরিদর্শন করে দেখা গেছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগে চিকিৎসকের কাছ থেকে সেবা নেয়ার পর কয়েকজন রোগীকে কয়েকটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বলা হয়। আর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ কম হওয়া সেখানে ভিড় করছেন রোগীরা। তবে রক্ত সংগ্রহ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার দায়িত্বে কেবল একজন থাকায় তিনি এতো রোগীকে সেবা দিতে পারছেন না। কোনোভাবে ৭ থেকে ৮ জনের কাছ থেকে রক্ত সংগ্রহ করে সেগুলোই পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন তিনি।
প্যাথলজি বিভাগের অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পদ্ধতি এখনো এনালগ হওয়ায় এই ৭ থেকে ৮ জনের পরীক্ষা-নিরাক্ষা করে রিপোর্ট প্রস্তুত করতেই বেজে যায় দুপুর ১ টার মতো। আর বাকি সেবাপ্রত্যাশীরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে ফিরে বাইরের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক স্টেন্টার ও ক্লিনিকে গিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে করে কয়েকগুণ বেশি টাকা গুনতে হয় ওইসব রোগীদের। তবে যেসব রোগীরা দুপুর ১টার ভেতর রিপোর্ট হাতে পান তারা পড়েন আরেক বিড়ম্বনায়। রিপোর্ট পেলেও ১টার পর অনেক সময় বহির্বিভাগের দায়িত্বরত চিকিৎসকরা চলে যাওয়ায় ওইদিন তা আর দেখাতে পারছেন না রোগীরা। তাদের আবার পরের দিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে চিকিৎসককে রিপোর্ট দেখাতে হয়।
এমন দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে লালমোহন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্যাথলজি বিভাগে চিকিৎসকের দেওয়া কয়েকটি পরীক্ষা করাতে যাওয়া আসমা বেগম ও সাইফুল ইসলামসহ কয়েকজন রোগী জানান, শারীরিক জটিলতার কারণে হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে এসেছি। ডাক্তার কিছু টেস্ট দিয়ে বলেছেন হাসপাতালের ২৪ নম্বর রুমে (প্যাথলজি বিভাগ) গিয়ে এসব টেস্ট করাতে। সেখানে নাকি কম মূল্যে এসব টেস্ট করানো যাবে। তাই ওই রুমে গিয়ে সাড়ে ১১ টার দিকে রক্ত দিয়েছি। রিপোর্ট পেয়েছি দুপুর ১ টার দিকে। এরপর যেই ডাক্তারকে দেখিয়েছি সেখানে গিয়ে ডাক্তারকে আর পাচ্ছি না। পরে হাসপাতালেরই কয়েকজন স্টাফ জানান ডাক্তার চলে গেছেন। রিপোর্ট পরের দিন আবার গিয়ে দেখাতে হবে। এতে করে সত্যিই চরম দুর্ভোগে পড়েছি।
অপরদিকে, আব্দুর রহিম নামে এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে নিয়ে লালমোহন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগে দায়িত্বপ্রাপ্ত এক চিকিৎসকের কাছে যান। চিকিৎসক তার স্ত্রীর রোগ নির্ণয়ের জন্য কয়েকটি পরীক্ষা করাতে বলেন। দুপুর ১২টা বেজে যাওয়ায় হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে গিয়ে তিনি ফিরে যান। কারণ সেখানে টেস্ট করাতে গেলে রিপোর্ট পেয়ে তা নিয়ে ওইদিন আর চিকিৎসককে দেখাতে পারবেন না। এজন্য বাধ্য হয়ে কয়েকগুণ বেশি খরচে বাইরের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে তার স্ত্রীকে দেওয়া পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলো করিয়ে ওই চিকিৎসককে গিয়ে রিপোর্ট দেখান। প্রতিবেদকের কাছে এভাবেই দুর্ভোগের বর্ণনা দিয়েছেন আব্দুর রহিম।
লালমোহন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্যাথলজি বিভাগের ইনচার্জ মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, এখানে একটি সেল কাউন্টার খুবই জরুরি। এটি না থাকায় ইচ্ছা থাকা শর্তেও রোগীদের পুরোপুরি সেবা দিতে পারছি না। এছাড়া জনবলও নেই, আমি একাই এ বিভাগের সব সামলাচ্ছি। যার ফলে ৭ থেকে ৮ জনের বেশি রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি আরো বলেন, কোনো ডাক্তার রোগীকে সিবিসি পরীক্ষা করাতে দিলে তা নিয়ে আমাদের অনেক কষ্ট করতে হয়, এনালগ পদ্ধতি এই পরীক্ষার রিপোর্ট প্রস্তুত করতে অনেক সময় নষ্ট হয়। আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা মূল্যের একটি সেল কাউন্টারের জন্য রোগীসহ আমাদেরও নিয়মিত চরম বিপাকে পড়তে হয়। অথচ এই সেল কাউন্টারটি থাকলে খুব সহজেই আমরা সিবিসিসহ আরো বেশ কিছু সেবা দিতে পারতাম। এখন যেখানে ৭ থেকে ৮ জন রোগীর পরীক্ষার-নিরীক্ষা করা হয়, তখন অন্তত ২৫ থেকে ৩০ জনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যেতো। তখন এইখাত থেকে রাজস্ব আদায়ও বাড়তো। তাই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত এই প্যাথলজি বিভাগে একটি সেল কাউন্টার মেশিন দেওয়া দাবি জানাচ্ছি।
লালমোহন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. মো. তৈয়বুর রহমান জানান, প্যাথলজি বিভাগে একটি সেল কাউন্টার সত্যিই খুব প্রয়োজন। যার জন্য কয়েকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছি। আবার আবেদন করবো। আশা করছি, এই উপজেলার অসহায় ও দরিদ্র রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে অতিদ্রুত সময়ের মধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্যাথলজি বিভাগে একটি সেল কাউন্টার প্রদানের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবেন।

এই বিভাগের আরোও খবর

Logo