ঢাকার পার্শ্ববর্তী শিল্পঘন এলাকা সাভার ও আশুলিয়া—যেখানে প্রতিদিন লাখো মানুষের কর্মজীবন নির্ভর করে সড়ক যোগাযোগের ওপর। কিন্তু সামান্য বৃষ্টি হলেই এখানকার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো পানির নিচে তলিয়ে যায়, সৃষ্টি হয় চরম দুর্ভোগ। স্থানীয় বাসিন্দা, শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের কাছে এটি এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা। দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা থাকলেও কার্যকর কোনো স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে এলাকাবাসীর মধ্যে।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হয় আশুলিয়ার নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়ক সংলগ্ন বাইপাইল এলাকা। বৃষ্টি হলেই বাইপাইল বাসস্ট্যান্ড থেকে জিরাবো পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন অংশে পানি জমে যায়। এছাড়া আশুলিয়ার জিরাবো-ইয়ারপুর সড়ক, নয়ারহাট-গাজিরচট সড়ক, কাঠগড়া-আশুলিয়া বাজার সড়ক এবং সাভারের আমিনবাজার-হেমায়েতপুর,ফুলবাড়িয়া , সাভার পৌরসভার মহল্লার বেশ কয়েকটি সড়কেও একই চিত্র দেখা যায়। এসব সড়কে পানি জমে থাকায় যান চলাচল ধীরগতির হয়ে পড়ে, অনেক সময় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা দিলু মিয়া বলেন, “প্রতি বছর বর্ষা এলেই আমাদের একই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। সামান্য বৃষ্টি হলেই হাঁটু পানি জমে যায়। অফিসে যেতে দেরি হয়, বাচ্চারা স্কুলে যেতে পারে না।” তিনি আরও বলেন, “এত উন্নয়ন হচ্ছে, কিন্তু ড্রেনেজ ব্যবস্থার কোনো উন্নতি নেই।”
আশুলিয়ার জামগড়া এলাকার গার্মেন্টস কর্মী রুবিনা আক্তার জানান, “কারখানায় যেতে হলে আমাদের ভোরে বের হতে হয়। কিন্তু রাস্তা পানিতে ডুবে থাকলে সময়মতো পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এতে আমাদের বেতন কাটা যায়। মালিকরা কোনো অজুহাত শুনতে চান না।”
শুধু শ্রমিক নয়, ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। নয়ারহাট বাজারের দোকানদার সোহেল রানা বলেন, “দোকানে পানি ঢুকে পণ্য নষ্ট হয়ে যায়। ক্রেতারাও আসতে পারে না। কয়েকদিন বৃষ্টি হলেই ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থাই এই জলাবদ্ধতার মূল কারণ। যেখানে সেখানে ভবন নির্মাণ, খাল-ডোবা ভরাট এবং ড্রেনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করায় পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই পানি জমে যায়।
শিক্ষার্থীরাও পড়াশোনায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এ বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সমস্যার কথা স্বীকার করেছেন। তারা বলছেন, ইতোমধ্যে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবে তা পর্যাপ্ত নয়। সাভার পৌরসভার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ চলছে। তবে দ্রুত নগরায়ণের কারণে সমস্যা বেড়ে গেছে। আমরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিচ্ছি।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, সঠিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল পুনঃখনন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব নয়। এছাড়া নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম প্রয়োগ করা জরুরি।
পরিবেশবিদ মাহমুদুল হাসান বলেন, “প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ধ্বংস করার ফলেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।”
এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক। তারা চান, শুধু আশ্বাস নয়, বাস্তব কাজের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা হোক। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমের আগেই সড়ক ও ড্রেন সংস্কার, খাল পুনরুদ্ধার এবং পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
সর্বোপরি, সাভার-আশুলিয়ার এই জলাবদ্ধতা সমস্যা শুধু একটি স্থানীয় সমস্যা নয়, এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলের উৎপাদন ও অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলছে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি






