পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলায় বেড়িবাঁধ ও সড়ক সংস্কারের নামে প্রায় ৩০ বছর আগে রোপণ করা বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ২০০ গাছ উপড়ে ফেলার অভিযোগ উঠেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এতে স্থানীয় গাছের মালিক ও উপকারভোগীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে দাবি করেছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বেড়িবাঁধ সংস্কারকাজে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে এবং প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় গাছগুলো এস্কাভেটর যন্ত্র দিয়ে উপড়ে ফেলা হয়েছে। ফলে একদিকে উপকারভোগীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, অন্যদিকে সরকারও সম্ভাব্য রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সংস্কারের আড়ালে গাছ নিধনের অভিযোগ
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার আমড়াগাছিয়া ইউনিয়নের উত্তর ঝাটিবুনিয়া গ্রামে শ্রীমন্ত নদের তীরঘেঁষা বেড়িবাঁধ সংস্কারের কাজ চলছে। কিসমত ঝাটিবুনিয়া থেকে উত্তর ঝাটিবুনিয়া পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে লাগানো মেহগনি, রেইনট্রি, চাম্বলসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ২০০ গাছ উপড়ে ফেলে ফসলি জমি ও সড়কের পাশে ফেলে রাখা হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গাছগুলো কেটে বিক্রি বা সরকারি নিলামের মাধ্যমে অপসারণ না করে সরাসরি উপড়ে ফেলার ফলে কাঠের গুণগত মান নষ্ট হয়েছে। এতে যেমন উপকারভোগীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তেমনি পরিবেশেরও অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।
১৯৯৬ সালের বনায়ন কর্মসূচির গাছ
বন বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৬ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে বেড়িবাঁধ সংরক্ষণ ও পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে বনায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের অংশীদার করা হয়েছিল, যাতে গাছ বড় হলে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারেন।
কাঁঠালতলী থেকে মহিষকাটা পর্যন্ত প্রায় ৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ এলাকায় ওই কর্মসূচির আওতায় কয়েক হাজার গাছ রোপণ করা হয়। বর্তমানে এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ১০০ মিটার এলাকায় সংস্কারকাজ চলছে। স্থানীয় উপকারভোগীদের দাবি, উপড়ে ফেলা প্রায় ২০০ গাছের বর্তমান বাজারমূল্য অন্তত ছয় লাখ টাকা।
উপকারভোগীদের দাবি—‘আমাদের না জানিয়েই গাছ তুলে ফেলেছে’
স্থানীয় উপকারভোগী ও কৃষকদের অভিযোগ, গাছ অপসারণের আগে তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি। এমনকি বন বিভাগ বা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কোনো ধরনের নোটিশ দেওয়া হয়নি।
একাধিক উপকারভোগী জানান, “এই গাছগুলো আমরা বছরের পর বছর পরিচর্যা করেছি। এখন সংস্কারের নামে রাতারাতি যন্ত্র দিয়ে উপড়ে ফেলায় আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হলাম। গাছ বিক্রির টাকা বা ক্ষতিপূরণ—কিছুই পাইনি।”
সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘনের প্রশ্ন
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি জায়গায় রোপণ করা সামাজিক বনায়নের গাছ অপসারণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় বন বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে মূল্য নির্ধারণ ও নিলামের ব্যবস্থা থাকার কথা। কিন্তু এখানে সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পরিবেশবাদীদের মতে, পরিণত গাছ উপড়ে ফেলা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, এটি পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্যও হুমকি। এসব গাছ এলাকায় ছায়া, মাটি সংরক্ষণ এবং নদীভাঙন প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিল।
তদন্ত ও ক্ষতিপূরণের দাবি
স্থানীয়রা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত উপকারভোগীদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে সরকারি উন্নয়নকাজে সামাজিক বনায়নের গাছ অপসারণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারা।





