নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য বহন করে চলছে বউমেলা। পহেলা বৈশাখে শুরু হওয়া এ মেলার দ্বিতীয় দিন বুধবার ছিল মূল আকর্ষণ, যেখানে নারী অংশগ্রহণেই মুখর হয়ে ওঠে পুরো আয়োজন।
উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন জয়রামপুর এলাকার শতবর্ষী বটগাছের নিচে বসা এ মেলায় সকাল থেকেই ভিড় করতে থাকেন সনাতন ধর্মাবলম্বী নারীরা। নববধূ থেকে শুরু করে কুমারী মেয়েরা রঙিন সাজে, হাতে ফলফলাদির ঝুড়ি নিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে পূজা-অর্চনায় অংশ নেন। সবার দৃষ্টি ছিল বটবৃক্ষের দিকে, যাকে অনেকেই ‘সিদ্ধেশ্বরী দেবী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
স্থানীয়রা জানান, তাদের কাছে এ বটবৃক্ষটি পুণ্যের প্রতীক। বছরের এ বিশেষ দিনটির জন্য অপেক্ষা করেন নারীরা। স্বামী-সংসারের মঙ্গল, সুখ-শান্তি এবং দাম্পত্য জীবনের স্থায়িত্ব কামনায় তারা পূজা দেন। এ উপলক্ষে কবুতর ওড়ানো এবং পাঁঠা বলির আয়োজনও করা হয়।
মেলায় ঘুরে দেখা যায়, মৃৎশিল্পীদের তৈরি রঙিন টেপা পুতুল, হাতি-ঘোড়া, পাখি, বাঘ-ভালুক, হাড়িপাতিলসহ বিভিন্ন সামগ্রীর দোকান বসেছে। পাশাপাশি রয়েছে মন্ডা-মিঠাইয়ের নানা পসরা।
মাধবদী এলাকার গৃহবধূ শীলা রানী দাস বলেন, “প্রতিবছরই আমি এখানে আসি। এই বটতলায় পূজা দিলে সংসারে শান্তি থাকে—এটাই আমাদের বিশ্বাস।”
নববধূ পূজা রাণী বলেন, “বিয়ের পর এই প্রথম বউমেলায় এলাম। স্বামী-সংসারের সুখ আর দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনের জন্য প্রার্থনা করেছি।”
কলেজছাত্রী মিতালী সরকার বলেন, “শুধু পূজা নয়, এই মেলাটা আমাদের সংস্কৃতির একটা বড় অংশ। ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি, তাই এবারও বন্ধুদের নিয়ে এসেছি।”
বয়োজ্যেষ্ঠ নারী বাসন্তী রানী দাস বলেন, “এই মেলা আমাদের পূর্বপুরুষদের আমল থেকে চলে আসছে। আমরা চাই এই ঐতিহ্য যেন ভবিষ্যতেও টিকে থাকে।”
পুরোহিত উৎপল ভট্টাচার্য বলেন, “শত শত বছর ধরে এ মেলা চলে আসছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে নারীরা এখানে এসে পূজা-অর্চনায় অংশ নেন। দুপুরে আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে পূজা শেষে মেলার কার্যক্রম শুরু হয়।”
আয়োজক কমিটির সদস্য নিলোৎপল রায় জানান, প্রতি বছর বর্ষবরণ উপলক্ষে সিদ্ধেশ্বরী কালীপূজার আয়োজন করা হয়। সার্বজনীনভাবে এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন এ মেলার আয়োজন করেন এবং দেশ ও মানুষের শান্তি কামনায় প্রার্থনা করেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ আল জিনাত বলেন, “বউমেলাকে কেন্দ্র করে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। এটি নারীকেন্দ্রিক একটি ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজন, যা উপভোগ করতে বিভিন্ন ধর্মের মানুষও অংশ নিচ্ছেন।







