উজানে টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও ভারতের থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তিস্তা নদীর পানি আবারও দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
সোমবার (১৩ জুলাই) সন্ধ্যা ৭টায় লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার ডালিয়া ব্যারাজ পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার তিস্তা তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও স্থানীয় প্রশাসন সার্বক্ষণিক নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, সোমবার দুপুর ৩টায় ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে বিকেল ৬টার পর থেকে উজানের ঢলের কারণে পানির উচ্চতা দ্রুত বাড়তে শুরু করে। সন্ধ্যা ৭টায় পানির উচ্চতা দাঁড়ায় ৫২ দশমিক ২৫ মিটারে, যা বিপৎসীমা ৫২ দশমিক ১৫ মিটারের চেয়ে ১০ সেন্টিমিটার বেশি। পানির অতিরিক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিস্তা ব্যারাজের সব ৪৪টি জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে।
পানি বৃদ্ধির ফলে ডিমলা, জলঢাকা ও তিস্তা তীরবর্তী বিভিন্ন চরাঞ্চল এবং নিম্নভূমিতে নতুন করে পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে কৃষিজমি, সবজি ক্ষেত, মাছের ঘের ও নিচু এলাকার বসতবাড়িতে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। এতে নদীতীরবর্তী মানুষের মধ্যে আবারও বন্যা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
ডিমলা উপজেলার খালিশা চাপানী ইউনিয়নের বাইশপুকুর এলাকার বাসিন্দা শহীদ উদ্দিন জানান, চলতি মৌসুমে এর আগের দুই দফা বন্যায় তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অনেক পরিবার এখনো সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এরই মধ্যে আবার নতুন করে পানি বাড়তে থাকায় তারা চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ খান বলেন, তিস্তার পানি বাড়তে থাকায় ইউনিয়নের নদীবেষ্টিত কয়েকটি এলাকায় ইতোমধ্যে পানি প্রবেশ করেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চরাঞ্চলের কিশামত চারালাকা ও আশপাশের নিচু এলাকায় অনেক বাড়িঘর ইতোমধ্যে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। মানুষ তাদের গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিস্তা নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহীন বলেন, জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক করা হচ্ছে। পানি আরও বৃদ্ধি পেলে নিচু এলাকার মানুষকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
নীলফামারীর ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, দুপুরের পর থেকে তিস্তার পানি ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে পানি বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্টরা প্রস্তুত রয়েছেন।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ২৮ জুনও তিস্তার পানি বিপৎসীমার ১২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। অল্প সময়ের ব্যবধানে আবারও পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় তিস্তাপাড়ের মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়ে গেছে।
এদিকে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার নদী-সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে অথবা বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর তিস্তা নদীতে বিপুল পরিমাণ পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় নদীর নাব্যতা ও পানি ধারণক্ষমতা ক্রমাগত কমে যাচ্ছে। ফলে অল্প বৃষ্টিপাত কিংবা উজানের পাহাড়ি ঢলেই নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে তীর উপচে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। প্রতিবছর বন্যা ও নদীভাঙনের কারণে হাজার হাজার একর আবাদি জমি, বসতভিটা, রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।
তিস্তাপাড়ের বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহলের দাবি, তিস্তা নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত ও কার্যকর ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। তাদের মতে, এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নদীর পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি কমবে, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং তিস্তাপাড়ের লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।





