জোয়ারের পানিতে প্লাবিত মনপুরার ৬০ পরিবার, পানিবন্দী কয়েক হাজার মানুষ

ভোলার মনপুরা উপজেলার মনপুরা ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডে বেড়িবাঁধের বাইরের একটি গুচ্ছগ্রাম জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এতে অন্তত ৬০টি পরিবার পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। ঘরবাড়ি, উঠান ও চলাচলের পথ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন বাসিন্দারা। এতে পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন কয়েক হাজার মানুষ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মেঘনা নদীর জোয়ারের পানিতে প্রতিদিনই গুচ্ছগ্রামটিতে পানি ঢুকে পড়ছে। ফলে ঘরের খাট, আসবাবপত্র ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পানিতে ডুবে যাচ্ছে। রান্নার চুলা তলিয়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার ঠিকমতো খাবার রান্না করতে পারছে না। একই সঙ্গে দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। শিশু, নারী ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এটি নতুন কোনো সমস্যা নয়। বছরের পর বছর ধরে প্রতিটি জোয়ারে তারা একই দুর্ভোগের শিকার হলেও এবার পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মেগা প্রকল্পের আওতায় নতুন বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ চলমান থাকায় পুরোনো বেড়িবাঁধ কেটে ফেলা হয়েছে। কিন্তু নতুন বাঁধের নির্মাণকাজ এখনো শেষ না হওয়ায় কোনো ধরনের সুরক্ষা ছাড়াই জোয়ারের পানি সরাসরি গুচ্ছগ্রামে প্রবেশ করছে। এতে প্রতিটি জোয়ারে বসতঘর, উঠান ও চলাচলের পথ পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে বেড়িবাঁধ বিহীন ৫নং কলাতলী ইউনিয়নের চরকলাতলী, কাজীরচর ও ঢালচর এলাকার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। এসব এলাকা ৫ থেকে ৭ ফুট জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে বলে জানান কলাতলী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আমিন তালুকদার। অন্যদিকে, রামনেওয়াজ লঞ্চঘাট জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যাত্রীদের কোমরসমান পানি পেরিয়ে লঞ্চে ওঠানামা করতে হয়েছে। এতে নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ে।
৬০ কলোনির বাসিন্দা ইয়াছিন, কামাল, সখিনা বেগমসহ কয়েকজন জানান, দিনে ও রাতে দুই দফা জোয়ারের পানিতে তাঁদের বসতঘর প্লাবিত হচ্ছে। পরিবার-পরিজনকে নিয়ে টিনের চালের ওপর আশ্রয় নিতে হচ্ছে। বিশেষ করে রাতের জোয়ারে চরম আতঙ্কে থাকতে হয়। কখন পানি আসবে, কখন নামবে-এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই দিন কাটছে। রামনেওয়াজ ঘাট এলাকার বাসিন্দা নাহিদ, মোস্তফা ও মমিন তালুকদার জানান, লঞ্চঘাটসহ আশপাশের এলাকা জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে। হাজারো মানুষ পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
নাম প্রকাশ না করার শথ্যে একজন ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দা বলেন, আমরা উন্নয়নের বিরোধী নই। কিন্তু উন্নয়নের কারণে যদি মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও হারাতে হয়, তাহলে সেই উন্নয়নের সুফল আমাদের জন্য কোথায়? প্রতিটি জোয়ারে মনে হয় সবকিছু হারিয়ে ফেলব।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দাবি, দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ খাবার পানি, শুকনো খাবার, শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য এবং জরুরি মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি জোয়ারের পানি প্রবেশ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানান তারা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্যমতে, মেঘনা নদীতে জোয়ারের পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ভোলা পাউবো-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়া উদ্দিন আরিফ জানান, শুক্রবার বিকেলে মেঘনা নদীতে জোয়ারের উচ্চতা ছিল ৩ দশমিক ৩৬ মিটার। যেখানে বিপদসীমা ২ দশমিক ৯৫ মিটার। আজ শনি ও রোববার পর্যন্ত জোয়ারের এই উচ্চতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে পাউবো। এরপর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।
এছাড়া জোয়ারের কারণে জেলার সদর উপজেলার রাজাপুর, কাচিয়া, ভেলুমিয়া, ভেদুরিয়া ও চর মোহাম্মদ, দৌলতখানের মদনপুর, মেদুয়া, ভবানীপুর ও হাজিপুর এবং তজুমদ্দিনের সোনাপুর, মলংচরা, চাঁদপুর, চরফ্যাশনের ঢালচর, কুকরি-মুকরি ও মুজিবনগর এবং লালমোহনের পশ্চিম চর উমেদের নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে।
অন্যদিকে জোয়ারের পানিতে ভোলা সদর উপজেলার ইলিশা ফেরিঘাট ও লঞ্চঘাট তলিয়ে যাওয়ায় যাত্রী এবং পণ্যবাহী যানবাহন চালকদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। পানিতে ঘাট তলিয়ে থাকায় ফেরিতে যানবাহন ওঠানামা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অপরদিকে, বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ও ঘের তলিয়ে যাওয়ায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। আমন ধানের বীজতলা, আধা পাকা আউশ ধান, লাউ ও সবজিখেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মাঠে পানি আটকে থাকায় গবাদিপশুর জন্য ঘাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
পাউবোর ডিভিশন-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসাফউদ্দৌলা বলেন, জোয়ারের কারণে মেঘনা নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় মনপুরার বেড়িবাঁধের ভেতর ও বাইরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। রামনেওয়াজ এলাকার পুরোনো বেড়িবাঁধ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: আবু মুছা জানান, জোয়ারে কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ৩০টি পরিবারের মাঝে শুক্রবার বিকেলে খাদ্য সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, দ্রুত টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসরত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে প্রতিটি জোয়ারে তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন