বিশ্ববিদ্যালয় জীবন একসময় কেবল উচ্চশিক্ষা, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ গড়ার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের কিছু শহরে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ-তরুণীদের জীবনধারায় নানা সামাজিক ও নৈতিক পরিবর্তনের চিত্র সামনে আসছে, যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অভিভাবক, শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্লেষকরা।
বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলোতে আধুনিক জীবনধারা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব, অনিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা এবং অপরিকল্পিত বন্ধুত্বের কারণে কিছু শিক্ষার্থী ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ উঠছে। বিভিন্ন পার্ক, রেস্টুরেন্ট, গোপন আড্ডাকেন্দ্র ও আবাসিক হোটেলকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে নতুন সামাজিক বাস্তবতা, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক ও নৈতিক বিকাশ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি শুধু ব্যক্তি জীবনের বিষয় নয়; বরং পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। বর্তমানে কিছু তরুণ-তরুণী সম্পর্ক, বিনোদন ও আধুনিকতার নামে এমন জীবনযাপনে জড়িয়ে পড়ছে, যা অনেক সময় তাদের শিক্ষা, ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
একাধিক অভিভাবক জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর সন্তানদের ওপর পারিবারিক নজরদারি কমে যায়। ফলে অনেকেই ভুল বন্ধুত্ব, অনলাইন প্রভাব কিংবা অপরিকল্পিত স্বাধীনতার কারণে বিপথে চলে যেতে পারে।
একজন অভিভাবক বলেন,
“আমরা সন্তানদের উচ্চশিক্ষার জন্য শহরে পাঠাই সুন্দর ভবিষ্যতের আশায়। কিন্তু তারা কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কেমন পরিবেশে সময় কাটাচ্ছে—সেসব বিষয়েও এখন গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।”
শিক্ষাবিদদের মতে, বর্তমান সময়ে নৈতিক শিক্ষা, পারিবারিক বন্ধন এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার চর্চা আগের তুলনায় কমে যাওয়ায় তরুণদের একটি অংশ সহজেই বিভ্রান্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রদর্শনবাদী সংস্কৃতি ও বিলাসী জীবনধারার প্রচারও তরুণদের মানসিকতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
একজন সমাজ বিশ্লেষক বলেন,
“সব শিক্ষার্থীকে একইভাবে দেখা উচিত নয়। অধিকাংশ তরুণ-তরুণী এখনো পরিশ্রম, শিক্ষা ও স্বপ্ন নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে। তবে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা পুরো সমাজের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন,
“সমস্যার সমাধান কেবল সমালোচনা নয়; প্রয়োজন সচেতনতা, পারিবারিক যোগাযোগ, মানসিক সহায়তা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইতিবাচক সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি করা।”
মনোবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, তরুণ বয়সে আবেগ, স্বাধীনতা ও সামাজিক চাপের কারণে অনেকেই ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। তাই পরিবারকে সন্তানদের প্রতি কড়া নজরদারির পাশাপাশি বন্ধুসুলভ আচরণও করতে হবে, যেন তারা কোনো সমস্যায় পড়লে সহজে পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে পারে।
সচেতন মহল বলছে, সমাজের নৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে হলে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনসহ সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তরুণদের জন্য খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা বাড়ানো গেলে তারা ইতিবাচক পথে এগিয়ে যাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি সুস্থ সমাজ গড়তে তরুণ প্রজন্মকে শুধু নিয়ন্ত্রণ নয়, সঠিক দিকনির্দেশনা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা দেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেবে।
Displaying





