আর কত বয়স অইলে জেলে কার্ড পামু ? সরকারি সুবিধা বঞ্চিত ভোলার নারী জেলেরা

জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি নিয়ে নদীতে মাছ স্বীকার করলেও সরকারি তালিকায় জেলে হিসেবে স্বীকৃতি না থাকায় সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন উপকূলীয় জেলা ভোলার কয়েক হাজার নারী জেলে। নারী জেলেদের অভিযোগ, পুরুষতান্ত্রিক প্রথা ও তালিকার অসংগতির কারণে বছরের পর বছর অবহেলিতই থেকে যাচ্ছেন তারা। তাই পুরুষদের পাশাপাশি নারী জেলেদেরও জেলে হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে জেলে কার্ড দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন নারী জেলেদের। এদিকে উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত নারী জেলেদের জেলে হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
জানা গেছে, নদী ও সাগর বেষ্টিত দ্বীপজেলা ভোলা। এই জেলার একটি বড় অংশই পেশায় জেলে। জেলেদের মধ্যে নারী জেলে যারা উপকূল অঞ্চলের নারী মৎস্যজীবি। তাদের শ্রম আছে, ঘাম আছে, জীবন ঝুঁকি রয়েছে তবুও তাদের নেই কোনো সরকারি পরিচয়, নেই কোনো স্বীকৃতি। হাজারো নারী জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে নদীতে মাছ ধরছেন। তবে সরকারি তালিকায় জেলে হিসেবে স্বীকৃতি না থাকায় বিভিন্ন সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। নারী হওয়ায় নাম লেখাতে পারছেনা জেলে তালিকায়। তাই পুরুষদের মতো নারী জেলেদেরও সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে জেলে কার্ড দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
তেমনি একজন নারী জেলে কুলসুম বেগম। বয়স ৬০ পেরিয়ে গেছে। জীবিকার তাগিদে স্বামীকে নিয়ে নদীতে থাকে মাছ ধরে জীবীকা নির্বাহ করে। কিন্তু এতো বছর পেরিয়ে গেলেও সরকারি সহযোগিতা খাতায় তার নাম নেই। অনেকটা কষ্ট নিয়ে বলেন আর কত বয়স হলে জেলে কার্ড পামু সরকারি সহযোগিতা পামু। এই বয়সে নদীতে না গিয়ে ইট্টু ঘর করে উপরে থাকতে চাই। রোদে পুরি, বৃষ্টিতে ভেজি। এখন সরকার যদি আমাদের ইট্টু খোঁজে খবর নিতো তাইলে ভালো অইতো।
ভোলা সদর রাজাপুর জোরখাল এলার নৌকায় থেকে মাছ ধরে রাশিদা বেগম বয়স (৫৫) জানান, আমাগো জন্ম হইছে নৌকার মধ্যে। ছোট বেলা থেকে নৌকায় তাহি মাছ ধরে সংসার চালাই। অথচ আমাগো কোন নাম নাই। সরকার আমাগোরে কোন জেলেকার্ড দেয়না। সরকার বাড়িদেয় ঘর দেয় কলনী দেয়। অথচ আমরা কিছু পাইনা। আমরা নদীতে নদীতে পোলাই লোয়া বাস করি। এই বাস করতে করতে বুড়ার বাগী হইছি (বুড়া হইছি) সরকার অহন পর্যন্ত কিছুই দেয়ানা। নতুন সরকারকে আমরা আশাকরে ভোট দিছি। আশাকরছি তারেক জিয়া যদি সরকার হয় আমাগোদিক চাইবে। এহন তারেক জিয়া যদি আমাগো দিক চায় তাইলে বাড়ি ঘর কোন হানে লাইন করে দেয় তাহলে আমরা জেলে কার্ড পামু, ঘর পামু।
অপর নারী জেলে রোজিনা বলেন, আমরা নদীর মধ্যে থাকি পোলান ছায়ন (ছেলে-সন্তান) নিয়ে অনেক কষ্ট করি। এমনকি পুরুষের থেকে আমরা মহিলারা অনেক কষ্ট করি। মাথার গাম পায় পড়ে। নদীতে মাছ ধরে দুই হাজার টাকার মাছ বেচলে তিন হাজার টাকা বাহি থাকে। ঠিক মতো চাল, তেল কিনলে বাকি সদায় করতে পারিনা। এখন আমাগো জেলে কার্ড কিংবা সরকার কইছে ফ্যামিলি কার্ড দিবো। সেটা থাকলে ভালো হইতো।
সংগ্রামী এই নারীদের জেলে হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন মৎস্যজীবী নেতারাও। ভোলা জেলা ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ এরশাদ উল্ল্যাহ জানান, ভোলাতে পুরুষের পাশাপাশি ২ থেকে ৩ হাজার নারী রয়েছে যারা মৎস্য জীবী পেশার সাথে জড়িত। এই মহিলার সরকারের জেলে নিবন্ধনের আওতায় এখনও আনা হয়নি। নিবন্ধন না থাকায় সরকারি সকল সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমি সরকারের কাছে দাবি জানাই পুরুষ জেলেদের পাশাপাশি মহিলা জেলেদেরও যেন নিবন্ধন আওতায় আনা হয়। তারা পুরুষের পাশাপাশি অনেক কষ্ট করে মাছ ধরে। তাদের বাহির রাখলে দেশ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। পাশাপাশি তাদের সরকারি সকল সুযোগ সুবিধা আওতায় আনার দাবি জানান।
এদিকে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত নারী জেলেদের জেলে হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জেলা মৎস কর্মকর্তা ও সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা। ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন বলেন, আমরা সামনে যে জেলে নিবন্ধন করা হবে সেখানে আমরা বেদে নারী জেলেদের অগ্রাধিকার দিবো। তবে তাদের স্ব-স্ব উপজেলা ও জেলার নাগরিক হতে হবে। তাদের সুর্নিদিষ্ট স্থায়ী ঠিকানা নিশ্চিত করার কথা জানান। এছাড়াও এবছর জেলেদের বিশেষ খাদ্য বরাদ্দ মধ্যে ৪০০ পরিবারকে আমরা সহযোগিতা করবো বলে জানান এই মৎস্য কর্মকর্তা।
ভোলা সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: আরিফুজ্জামান জানান, সরকার যখন নতুন করে তালিকা করবে তখন মানতা সম্প্রদায়ের নারী জেলেদের নিবন্ধন আওতায় নিয়ে আসবো। পাশাপাশি সরকার সকল ধরনের সহযোগিতা আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেওয়া জন্য আমরা বদ্ধ পরিকর।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন