ডিমলায় দুর্নীতির অভিযোগে পল্লী বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও

নীলফামারীর ডিমলায় বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ভয়াবহ অনিয়ম ও গ্রাহক হয়রানির অভিযোগে উত্তাল হয়ে উঠেছে জনমত। সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পরও বিল, মিটার রিডিং না মিললেও অতিরিক্ত ইউনিট দেখিয়ে বিল এবং নষ্ট মিটারের নামে মাসের পর মাস অর্থ আদায়ের অভিযোগে ক্ষুব্ধ হাজারো গ্রাহক পল্লী বিদ্যুতের ডিমলা সাব-জোনাল অফিস ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছেন।
রোববার (২১ জুন) সকাল ১১টার দিকে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে আসা কয়েক হাজার গ্রাহক ডিমলা পল্লী বিদ্যুৎ সাব-জোনাল অফিসের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে তারা অফিস ঘেরাও করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ও সকল ভুয়া বিল বাতিলের দাবি জানান।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ ব্যবহার কম হলেও কয়েকগুণ বেশি ইউনিট দেখিয়ে বিল তৈরি করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পরও নিয়মিত বিল পাঠানো হচ্ছে। আবার নষ্ট মিটার পরিবর্তন না করেই অনুমাননির্ভর বিল আদায় করা হচ্ছে।
ডিমলা সদর ইউনিয়নের নটাবাড়ি গ্রামের কৃষক মশিয়ার রহমান জানান, তার সেচ সংযোগ গত দুই মাস ধরে বিচ্ছিন্ন থাকলেও ২ হাজার ৯৬৬ টাকার বিল ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই ইউনিয়নের মমিনুর রহমান অভিযোগ করেন, তার প্রকৃত ব্যবহারের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি বিল করা হয়েছে।
নাউতারা ইউনিয়নের আকাশকুড়ি গ্রামের রশিদুল ইসলাম বলেন, “আমার মিটারে রিডিং ৮৩৭, অথচ বিলে দেখানো হয়েছে ১১৯২ ইউনিট। এই অতিরিক্ত ইউনিট কোথা থেকে এলো?”
রামডাঙ্গা গ্রামের নুর ইসলাম জানান, ছয় মাস আগে তার মিটার নষ্ট হয়ে যায়। নতুন মিটারের জন্য আবেদন করলেও কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। অথচ সংযোগ কার্যত বন্ধ থাকার পরও নিয়মিত বিল পাঠানো হচ্ছে। সর্বশেষ বিলেও ৬০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব দেখানো হয়েছে।
গ্রাহকদের দাবি, এটি কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং ব্যাপক আকারে সংঘটিত একটি অনিয়ম, যার ফলে হাজারো পরিবার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। তারা অভিযোগ করেন, অফিসে গিয়ে প্রতিকার চাইলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো কার্যকর সমাধান পাওয়া যায় না।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ডিমলা পল্লী বিদ্যুতের সাব-জোনাল ম্যানেজার (এজিএম) মো. মাসুদ আলম সাংবাদিকদের জানান, ঈদের দীর্ঘ ছুটির কারণে মিটার রিডাররা যথাসময়ে রিডিং সংগ্রহ করতে পারেননি। ফলে বিল প্রস্তুতের সময় ভুল হয়েছে। তিনি বিল সংশোধন ও সমস্যার দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেন।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, কয়েক হাজার গ্রাহকের বিলে একযোগে ভুল কীভাবে হলো? এটি কি শুধুই প্রশাসনিক ত্রুটি, নাকি ব্যবস্থাপনার গুরুতর ব্যর্থতা? এমন প্রশ্ন এখন গ্রাহকদের মুখে মুখে।
ডিমলা সাব-জোনাল অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় প্রায় ৭৭ হাজার বিদ্যুৎ গ্রাহক রয়েছে। এর মধ্যে আবাসিক গ্রাহক ৬৫ হাজারের বেশি। ফলে বিলিং ব্যবস্থায় সামান্য অনিয়মও হাজারো মানুষের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
এ বিষয়ে নীলফামারী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বোর্ডের এলাকা পরিচালক প্রভাষক সাজেদুল ইসলাম লিটন বর্তমান এজিএম মাসুদ আলম ও বিলিং কর্মকর্তা নাসিমা বেগমকে দায়ী করে বলেন, দায়িত্বে অবহেলা ও তদারকির অভাবে গ্রাহকরা সীমাহীন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। বিষয়টি ইতোমধ্যে জেনারেল ম্যানেজারকে জানানো হয়েছে।
নীলফামারী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার শেখ মনোয়ার মোরশেদ বলেন, অনিয়ম হয়ে থাকলে বিল সংশোধন করা হবে। তবে স্বল্প সময়ে বিপুল সংখ্যক বিল কীভাবে সংশোধন করা হবে—এ প্রশ্নের জবাব না দিয়েই তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। প্রকৃতপক্ষে যদি সংযোগ বিচ্ছিন্ন বা মিটার বিকল থাকা অবস্থায় বিল আদায় করা হয়ে থাকে, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা উচিত।
এদিকে বিক্ষুব্ধ গ্রাহকরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, দ্রুত সংশোধিত বিল প্রদান এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন