​ক্রিকেটে কি তবে দিল্লির ‘রাজনৈতিক দাবার চাল

​ব্যাট-বলের চিরায়ত লড়াই ছাপিয়ে ক্রিকেট এখন বিলিয়ন ডলারের এক ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র। মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়েও যখন পর্দার ওপারের সমীকরণ বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখন ‘ভদ্রলোকের খেলা’ তকমাটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বর্তমান বিসিসিআই (BCCI) এবং আইসিসি-র (ICC) যৌথ অবস্থান বাংলাদেশের ক্রিকেটকে যে খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে, তাকে বিশ্লেষকরা দেখছেন একবিংশ শতাব্দীর ‘ক্রিকেটীয় উপনিবেশবাদ’ হিসেবে।

​দুবাই বনাম দিল্লি: ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু কোথায়?

​কাগজে-কলমে আইসিসি-র সদর দপ্তর দুবাইয়ে হলেও, এর হৃৎপিণ্ড এখন দিল্লির রাজনৈতিক করিডরে। আইসিসি-র আয়ের সিংহভাগ (প্রায় ৩৮.৫% থেকে ৮০%) আসে ভারতীয় বাজার থেকে। এই আর্থিক আধিপত্যকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বিসিসিআই কার্যত বিশ্ব ক্রিকেটের হর্তাকর্তা সেজে বসেছে। বর্তমান আইসিসি চেয়ারম্যান হিসেবে জয় শাহ-র অভিষেক এই প্রভাবকে কেবল নিরঙ্কুশই করেনি, বরং আইসিসি-কে বিসিসিআই-এর একটি ‘বর্ধিত শাখা’য় পরিণত করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

​‘মুস্তাফিজ কাণ্ড’: ষড়যন্ত্রের নীল নকশা?

​২০২৬ আইপিএল শুরুর প্রাক্কালে কলকাতা নাইট রাইডার্স (KKR) থেকে মুস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাটি নিছক দলবদল নয়। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার অজুহাত দেখিয়ে বাংলাদেশের এই সেরা পেসারকে ব্রাত্য করা ছিল বিসিবি-র ওপর চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল। এটি কেবল একজন খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ারে আঘাত নয়, বরং একটি দেশের ক্রিকেটীয় মর্যাদাকে অবদমিত করার সূক্ষ্ম চাল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

​বিশ্বকাপের আল্টিমেটাম ও দ্বিমুখী নীতি

​নিরাপত্তা ইস্যুতে ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতে না যাওয়ার যে অবস্থান বিসিবি নিয়েছে, তার বিপরীতে আইসিসি-র প্রতিক্রিয়া ছিল নজিরবিহীন। সরাসরি আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছে—হয় ভারতে খেলো, নয়তো বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ো। এমনকি বাংলাদেশের বিকল্প হিসেবে স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করার গুঞ্জন শুরু হয়েছে, যা একটি পূর্ণাঙ্গ টেস্ট খেলুড়ে দেশের জন্য চরম অবমাননাকর।

​এখানেই আইসিসি-র দ্বিমুখী নীতি স্পষ্ট হয়:

​পাকিস্তানের ক্ষেত্রে: ভারত যখন নিরাপত্তার অজুহাতে পাকিস্তানে যেতে অস্বীকার করে, আইসিসি ‘হাইব্রিড মডেল’ গ্রহণ করে।

​বাংলাদেশের ক্ষেত্রে: শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ সরানোর প্রস্তাবকে ‘লজিস্টিক জটিলতা’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

​এই বৈষম্য প্রমাণ করে যে, ক্রিকেটে এখন আইনের শাসনের চেয়ে ‘জোর যার মুলুক তার’ নীতি বেশি কার্যকর।

​‘সিস্টেমিক বায়াস’ ও মাঠের বিতর্ক

​২০১৫ বিশ্বকাপে রোহিত শর্মার বিতর্কিত ‘নো বল’ বা ২০২২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বিরাট কোহলির ‘ফেক ফিল্ডিং’ বিতর্কগুলো আজও সমর্থকদের মনে টাটকা। আইসিসি এগুলোকে ‘হিউম্যান এরর’ বললেও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সিদ্ধান্তগুলো বারবার প্রভাবশালী দলের পক্ষে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। এছাড়া DRS বা ‘আম্পায়ার্স কল’-এর মতো প্রযুক্তির ব্যবহারও অনেক সময় বড় দলগুলোর অনুকূলে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।

​পরিসংখ্যান: বাংলাদেশের উত্থান কি ভয়ের কারণ?

​গত এক দশকে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের লড়াইয়ের পরিসংখ্যানও এই রাজনৈতিক চাপের পেছনে কাজ করতে পারে:

​হাড্ডাহাড্ডি লড়াই: ২০১৫-২০২৪ পর্যন্ত ওডিআই ফরম্যাটে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়ের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

​বাণিজ্যিক প্রভাব: আইসিসি-র ডিজিটাল এনগেজমেন্টের প্রায় ২০% আসে বাংলাদেশ থেকে। বাংলাদেশকে ছাড়া টুর্নামেন্ট আয়োজন করা আইসিসি-র জন্য বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

​উপসংহার: অস্তিত্বের লড়াইয়ে বিসিবি

​বিসিসিআই এখন ক্রিকেটের ‘যুক্তরাষ্ট্র’। তারা যা চায়, আইসিসি তা-ই করে। কিন্তু বাংলাদেশ যদি তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকে, তবে বিশ্ব মানচিত্র থেকে একটি ক্রিকেট পাগল জাতিকে বিচ্ছিন্ন করার দায় আইসিসি-র ওপরই বর্তাবে। এতে ভারত হয়তো তার রাজনৈতিক দাপট প্রমাণ করবে, কিন্তু ক্রিকেটের ‘ভদ্রলোকের খেলা’ পরিচয়টি চিরতরে ধুলোয় মিশে যাবে। আজ ক্রিকেটের অস্তিত্ব রক্ষায় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং বিসিবি-র মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানো সময়ের দাবি।

মেহেদী হাসান হাবিব

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন