বটিয়াঘাটার দরগাতলার এক টুকরো জমিতে ধানের চারা দুলছে হালকা বাতাসে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় এ যেন উপকূলের কৃষি আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু জমির আল ঘেঁষে দাঁড়ানো কৃষকরা অন্য গল্প বলেন। কয়েক হাত নিচে নেমে গেলে মাটির ভেতরে এখনো লুকিয়ে আছে নোনা স্তর। বর্ষায় সবুজ হয়ে ওঠা জমি শুষ্ক মৌসুমে আবার সাদা লবণের আস্তরণে ঢেকে যায়। চাষ হয়, কিন্তু ফলন আগের মতো নয়। পানি আছে, কিন্তু তা অনেক সময় সেচের জন্য উপযোগী থাকে না। ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে যে লবণ পানির জলোচ্ছ্বাস খুলনার উপকূলে ঢুকে পড়েছিল, তার দীর্ঘ মেয়াদি প্রভাব এখনো কৃষির উপর অপঘাতের ছায়া হয়ে আছে।
মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান, কৃষকদের অভিজ্ঞতা, কৃষি বিভাগের তথ্য, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট(এস আর ডি আই) এর নমুনা বিশ্লেষণ এবং বিশেষজ্ঞ মতামত বলছে খুলনার উপকূলীয় কৃষি এখন জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা, পানি সংকট ও ব্যয়বৃদ্ধির বহুমুখী অভিঘাতে আটকে আছে। জমি পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি, কিন্তু টিকে থাকতে কৃষকদের লড়াই দিন দিন কঠিন হচ্ছে।
২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে খুলনা, কয়রা, দাকোপ, বটিয়াঘাটা, সাতক্ষীরা ও শ্যামনগরসহ দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা লবণাক্ত জলোচ্ছাসে প্লাবিত হয়। ভেঙে যায় বেড়িবাঁধ, ধ্বংস হয় ঘরবাড়ি, মাছের ঘের, ফসলি জমি ও অবকাঠামো। বহু এলাকা দীর্ঘ প্রায় দুই বছরেরও বেশী সময় লবণ পানির নিচে ছিল। শুধু আইলা নয় ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বরে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল, ২০২০ সালের ২০ মে সুপার সাইক্লোন আম্ফান, ২০২১ সালের ২৬ মে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস ও ২০২৪ সালের ২৬ মে ঘূর্ণিঝড় রেমাল খুলনার উপকূল ও সুন্দরবন অঞ্চলে আঘাত হানে। এসব ঝড়ে নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে নোনা জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ে ঘরবাড়ি, পুকুর, খাল ও বিস্তীর্ণ কৃষি জমিতে।
সময়ের সঙ্গে বসতি ফিরেছে, রাস্তাঘাট হয়েছে, নতুন ঘর উঠেছে। কিন্তু কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইলার সময় মাটির নিচে যে লবণের স্তর ঢুকে পড়ে, তার একটি অংশ দীর্ঘমেয়াদে মাটির স্বাভাবিক গঠন ও উর্বরতায় প্রভাব ফেলেছে। শুষ্ক মৌসুমে যখন ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামে, তখন কৈশিক ক্রিয়ায়(কোন বাহ্যিক শক্তির সহায়তা ছাড়াই স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে তরলের উপরে প্রবাহিত হওয়া) নিচের লবণ ওপরে উঠে আসে। তখন জমির উপরিভাগে সাদা লবণের স্তর দেখা যায়, যা চারা গজানো, শিকড় বিস্তার ও পুষ্টি গ্রহণে বাঁধা সৃষ্টি করে। লবণের এই দ্বি মুখী আচরণের সাথে যুক্ত হয়েছে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উজান থেকে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া, খাল নদীতে লবণাক্ততার পাদূর্ভাব এবং অপরিকল্পিত চিংড়ি ঘেরের বিস্তার। নদীর নোনা পানি কৃষি জমির আশপাশে ছড়িয়ে পড়ায় অনেক জমির উৎপাদনশীলতা কমেছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন এস আর ডি আই এর লবণাক্ততা ব্যবস্থাপনা ও গবেষণা কেন্দ্র বটিয়াঘাটা উপজেলার নদী, খাল ও মাটির নমুনা বিশ্লেষণ করে গত কয়েক বছরে একটি স্পষ্ট চিত্র পেয়েছে বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে লবণাক্ততার মাত্রা বিপজ্জনক ভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে উপজেলার ১৬ টি নদী ও খাল থেকে সংগ্রহ করা পানির নমুনায় ইলেকট্রিক্যাল কনডাক্টিভিটি(ই সি) ছিল ০.১৯ থেকে ০.৪৪ ডি এস / মিটার। কৃষি মানদণ্ড অনুযায়ী এই পানি সেচের জন্য নিরাপদ। সর্বোচ্চ লবণাক্ততা পাওয়া যায় কাজী বাছা নদীতে ০.৪৪ ডি এস / মিটার এবং সর্বনিন্ম নাহারিতলা খালে ০.১৯ ডি এস / মিটার। পরের বছর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে একই এলাকার পানিতে ই সি বেড়ে দাঁড়ায় ০.৪১ থেকে ০.৬২ ডি এস / মিটার। যদিও তা এখনো তুলনামূলক নিরাপদ পর্যায়ে ছিল, তবে গবেষকেরা এটিকে সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখেছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিবর্তন আসে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। বৃষ্টিপাত না থাকা, নদীতে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং জোয়ারের লবণাক্ত চাপে উপজেলার ১৬ টি উৎসের প্রতিটিতেই ইসি ৩.০ ডি এস / মিটার অতিক্রম করে। ঝপঝপিয়া নদীতে ৪.৯২ ডি এস / মিটার, গোবা খালে ৪.৩২ এবং সুরখালী ভদ্রা খালে ৪.২১ ডি এস / মিটার লবণাক্ততা রেকর্ড করা হয়। সরকারি মানদণ্ড অনুযায়ী এই পানি অধিক ক্ষতিকর এবং অধিকাংশ ফসলের জন্য সেচ অনুপযোগী।
তবে মাটির বিশ্লেষণে কিছু ইতিবাচক দিকও আছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে দেবিতলা, বাইনতলা, গুপ্তমারি, হেতালবুনিয়া, গাওঘরা, শিয়ালিডাঙ্গা ও বুজবুনিয়া এলাকা থেকে সংগৃহীত মাটির নমুনায় ই সি ২.২২ থেকে ২.৪৫ ডি এস / মিটারের মধ্যে ছিল, যা অলবণাক্ত বা কম ঝুঁকির পর্যায়ে পড়ে। অর্থাৎ, সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা ও উপযুক্ত ফসল নির্বাচন করলে কৃষির সম্ভাবনা এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
বটিয়াঘাটার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, বহু জমি মৌসুমি চাষের বাইরে বছরের বড় অংশ পতিত থাকে। কোথাও বোরো ধান, কোথাও শাকসবজি, কোথাও লবণসহিষ্ণু ধানের পরীক্ষা চলছে; কিন্তু কৃষকেরা বলছেন, উৎপাদন আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ভাবে কম।
কৃষক স্মৃতি রানী মণ্ডল বলেন, আগে এই জমিতে লাউ, পুঁইশাক, ঢেঁড়স, টমেটো সবকিছু ভালো হতো। এখন শুষ্ক মৌসুমে মাটির ওপরে লবণ উঠে আসে। পানি দিলেও গাছ ঠিকমতো বাড়ে না। দীপক কুমার মণ্ডল বলেন, আগে বীজ ফেললে গজিয়ে উঠত। এখন মাটির শক্তি কমে গেছে। সার বেশি লাগে, পানি বেশি লাগে, তারপরও ফলন কম।
অনেক কৃষকের অভিযোগ, চাষ এখন লাভের বদলে ঝুঁকির ব্যবসা হয়ে উঠছে। একদিকে ফলন কমছে, অন্যদিকে বীজ, সার, সেচ, জমি প্রস্তুতি ও শ্রমের ব্যয় বাড়ছে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের অনেকে বাধ্য হয়ে কৃষি ছেড়ে দিনমজুরি, মাছের ঘের কিংবা শহরমুখী কাজের দিকে ঝুঁকছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে লবণাক্ততা, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও পানি সংকটের প্রভাবে খুলনা অঞ্চলে অন্তত ১২১ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৮৫০ মেট্রিকটন। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ২ কোটি ৬১ লাখ ৪৯ হাজার ১০০ টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ৫ হাজার ৭৭ জন।
খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক অতিরিক্ত পরিচালক মোঃ নজরুল ইসলাম বলেন, উচ্চ তাপমাত্রাও এখন বড় সমস্যা। তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রির ওপরে উঠলে ফসলের ক্ষতি বাড়ে। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২ টার মধ্যে অতিরিক্ত তাপ ধানের জন্য ক্ষতিকর। অনেক সময় ধান চিটা হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লবণাক্ততা ও তাপমাত্রার যুগপৎ চাপ কৃষির ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তবু সংকটের মধ্যেও কৃষকরা হাল ছাড়েননি। বটিয়াঘাটার দরগাতলা গ্রামে প্রায় ৩০ – ৩৫ বিঘা দীর্ঘদিনের পতিত জমিতে নতুন করে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। কৃষি বিভাগের সহায়তায় ডিপ টিউবওয়েলের পানি ব্যবহার করে হাইব্রিড ধান রোপণ করা হয়েছে। স্থানীয় কৃষকেরা জানান, সেচের পানির লবণাক্ততা প্রায় ১৫৩০ পি পি এম বা ২.৩৯ ডি এস / মিটার হলেও ঝুঁকি নিয়েই চাষ করছেন।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জীবনান্দ রায় বলেন, অনেক জমি বহু বছর পতিত ছিল। কৃষকদের উৎসাহ দিয়ে আমরা সেচের বিকল্প ব্যবস্থা করছি। রূপসী রূপসা গ্রামেও প্রায় নয় একর জমিতে ধান চাষ শুরু হয়েছে। আরও ৯.৫ একর পতিত জমিকে আবাদে আনতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ ফুট দূরের খাল থেকে পাইপলাইনে পানি আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কৃষকেরা বলছেন, ছোট আকারের এই উদ্যোগ গুলো টেকসই করতে বড় অবকাঠামোগত সহায়তা দরকার।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের খুলনা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক রফিকুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ১০ লাখ হেক্টরের বেশি জমি লবণাক্ততায় আক্রান্ত। দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৯০ লাখ মানুষ এই সমস্যার প্রভাবের মধ্যে আছে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মতিউল ইসলাম বলেন, লবণাক্ত জমিতে কর্দমাক্ততা, অক্সিজেন ঘাটতি ও রোগবালাই বাড়ে। তিনি উঁচু বেড, রিজ অ্যান্ড ফারো, স্বর্জন পদ্ধতি ও পিট ক্রপিংয়ের মতো অভিযোজন প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দেন।
এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে পানি ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত বলেন, সামনে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। পৃষ্ঠস্থ পানির ব্যবহার, খাল পূনঃখনন, টেকসই বেড়িবাঁধ, জলাধার সংরক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক পানি ব্যবস্থাপনা ছাড়া লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে।
সরকার ইতিমধ্যে ব্রি ধান ৬৭, ব্রি ধান ৯৭, ব্রি ধান ৯৯ ও বিনা ধান ১০ এর মতো লবণসহিষ্ণু জাত মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণ করছে। তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে শুধু নতুন বীজ নয়, দীর্ঘমেয়াদি পানি অবকাঠামো, কৃষি ঋণ, ক্ষুদ্র কৃষকের আর্থিক সুরক্ষা এবং স্থানীয় পর্যায়ে টেকসই কৃষি পরিকল্পনা ছাড়া স্থায়ী সমাধান মিলবে না।
আইলার ১৭ বছর পর উপকূলের কৃষিজমিতে হয়তো আবার ধানের চারা উঠছে, কিন্তু খুলনার কৃষকের কাছে প্রশ্ন এখনো একই এই মাটি কি আগের মতো জীবন ফিরিয়ে দিতে পারবে, নাকি নোনা স্তর আরও গভীরে ডুবিয়ে দেবে উপকূলের কৃষিকে?






