বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি একতা বাজার ও তেলিবাজার সংলগ্ন তিস্তা নদীতে অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধ করতে গিয়ে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলনকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এ ঘটনায় টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহিন,ইউনিয়ন জামায়াতের আমীর আনোয়ার হোসেন,পুলিশ সদস্য, সাংবাদিক ও গ্রাম পুলিশসহ অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন। ঘটনাস্থল মুহূর্তেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
আহতদের মধ্যে গুরুতর অবস্থায় চেয়ারম্যানসহ ৭ জনকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। এছাড়া ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি রয়েছেন ইউনিয়ন জামায়াতের সাবেক আমির আফসার আলী, লোকমানসহ আরও অনেকে। আহতদের মধ্যে কয়েকজন পুলিশ সদস্যও রয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র তিস্তা নদীর তলদেশে বোমা মেশিন বসিয়ে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করে আসছিল। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি তীরবর্তী বাঁধ ও সড়ক মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে।
এ অবস্থায় চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহিন অবৈধ উত্তোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। বৃহস্পতিবার সকালে পাথর উত্তোলনের খবর পেয়ে তিনি গ্রাম পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে গেলে উত্তোলনকারী চক্রের সদস্যরা অতর্কিত হামলা চালায়। এতে চেয়ারম্যানসহ কয়েকজন গুরুতর আহত হন।
পরে পুলিশ ও স্থানীয় সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে গেলে হামলাকারীরা তাদের ওপরও চড়াও হয়। এতে অন্তত ৭ জন পুলিশ সদস্য ও ২ জন সাংবাদিক আহত হন। এসময় দুর্বৃত্তরা পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যান ভাঙচুর করে।
অপর দিকে শুক্রবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত তিস্তা নদীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৬ টি বোমা মেশিন, ৬ টি পাইপ, ৩০০ টি প্লাস্টিক ড্রাম এবং ১৯ টি পাথর উত্তোলনের লোহার ছাকনিসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করে বিনষ্ট করে প্রশাসনের নেতৃত্বে যৌথ বাহিনী। অভিযানের নেতৃত্ব দেন ডিমলা ইউএনও মোঃ ইমরানুজ্জামান, ৫১ বিজিবির উপ অধিনায়ক এ এফ এম জুলকার নাঈম,ডিমলা থানার ওসি শওকত আলী।
ডিমলা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শওকত আলী সরকার বলেন, চেয়ারম্যান পাথর উত্তোলন বন্ধ করতে গেলে, গ্রাম পুলিশ, থানা পুলিশের সদস্য, সাংবাদিক সবার ওপর পাথর উত্তোলনকারীরা হামলা চালায়। পুলিশের গাড়ী ভাঙচুর করে এতে অর্ধশত আহত হয় তার মধ্যে ১৭ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে গুরুতর ৭ জনকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়েছে। পরে ঘটনার রাতে থানায় পৃথক ৩ টি মামলা হয়েছে এবং ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমরা বাকি আসামীদের গ্রেপ্তার করতে চেষ্টা করছি।
৫১ বিজিবির উপ-অধিনায়ক মেজর এ এফ এম জুলকার নাঈম জানান, নীলফামারী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান ও ৫১ বিজিবির অধিনায়ক লেঃ কর্ণেল মোঃ সেলিম আলদীন এর যৌথ আলোচনার সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা অনুযায়ী অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদস্য ও ডিমলা নির্বাহী কর্মকর্তার সমন্বয়ে যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করে তিস্তা নদীতে অবৈধ বোমা মেশিন ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি ধ্বংস করা হয়। এমন অভিযান অব্যাহত রাখা হবে।
ডিমলা থানার উপপরিদর্শক পরিতোষ রায় জানান, অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধে গেলে হামলার ঘটনা ঘটে এবং পুলিশের ওপরও আক্রমণ চালানো হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পরদিন শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরানুজ্জামানের নেতৃত্বে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এতে বিজিবির ৬৩ জন, পুলিশের ৪০ জন এবং আনসার বাহিনীর ১০ জন সদস্য অংশ নেন। অভিযানে বিপুল পরিমাণ বোমা মেশিন ও পাথর উত্তোলন যন্ত্রাংশ ধ্বংস করা হয়।
এবিষয়ে ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো ইমরানুজ্জান বলেন, গত ১৯ মার্চ ঘটনার পর বিজিবি, পুলিশ, আনসার সদস্যসহ সবার সহায়তায় তিস্তার চরের বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে পাথর উত্তোলনের সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। তিস্তা নদী হতে পাথর উত্তোলন বন্ধে সকল ধরনের ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে । এছাড়াও ওই এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা পাথর উত্তোলনকারীদের আইনের আওতায় আনতে সহায়তা করছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়। তাছাড়া তিস্তায় অবৈধ পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।
এ ঘটনায় ডিমলা থানায় পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলাগুলোতে নামীয় ১০৬ জন ও অজ্ঞাত আরও ৪২৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৫ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
এদিকে তিস্তা পাড়ে এমন সহিংসতায় এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত জড়িতদের গ্রেফতার এবং অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধে স্থায়ী ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।






