নীলফামারীর ডিমলা উপজেলা প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযানের পরও থামছে না এই তাণ্ডব—বরং পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বোমা মেশিনের সংখ্যা। স্থানীয়দের ভাষায়, অভিযান যত বাড়ে, ততই শক্তিশালী হয়ে ওঠে সিন্ডিকেট।
বর্তমানে তিস্তার বিভিন্ন পয়েন্টে অর্ধশতাধিক বোমা মেশিন দিয়ে নদীর গভীর তলদেশ খুঁড়ে পাথর উত্তোলন চলছে প্রকাশ্যেই। অথচ প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের ঘোষণার পরও বাস্তবে কার্যকর কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তিস্তা নদী জুড়ে অবৈধ পাথর উত্তোলন এখন এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের বার্নির ঘাট, তেলীর বাজার, তিস্তা বাজার, চরখড়িবাড়ি ও দোহলপাড়া এলাকায় অন্তত চারটি পয়েন্টে গভীর খাদ তৈরি করে চলছে এই অবৈধ কার্যক্রম। মাত্র এক মাস আগেও যেখানে ১৫-২০টি বোমা মেশিন ছিল, সেখানে এখন সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে অর্ধশতাধিক—যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযান শুরু হওয়ার আগেই পাথর উত্তোলনকারী চক্র আগাম খবর পেয়ে যায়। ফলে দ্রুত মেশিন, পাইপসহ সব যন্ত্রপাতি সরিয়ে ফেলে তারা। অভিযান শেষ হতেই আবার শুরু হয় পুরোদমে পাথর উত্তোলন।
এ অবস্থায় অনেকেই এসব অভিযানকে ‘লোকদেখানো’ ও ‘দায় এড়ানোর কৌশল’ হিসেবে দেখছেন।
সিন্ডিকেটের দাপট, প্রশাসনের নীরবতা
অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে তিস্তার বুকে গভীর খাদ তৈরি করে পাথর উত্তোলন করছে। জেলা থেকে উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন দপ্তর ‘ম্যানেজ’ করেই এই অবৈধ বাণিজ্য চালানো হচ্ছে বলেও দাবি স্থানীয়দের। ফলে প্রশাসনের একাধিক সংস্থা—উপজেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধের দাবিতে এবার সরব হয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের একতার বাজারে তিস্তা অববাহিকার মানুষ মানববন্ধন করে দ্রুত এই কার্যক্রম বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ—নদী বাঁচাতে না পারলে আমাদের অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যাবে।
অবৈধভাবে নদীর তলদেশ খননের ফলে তিস্তার ভাঙন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। গত বর্ষা মৌসুমে ডিমলা উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের মধ্যে অন্তত ৬টিতে তীব্র ভাঙন দেখা দেয়। খালিশা চাপানি ইউনিয়নের ছোটখাতা সুপারিটরি গ্রামে শত শত একর আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। অসংখ্য পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
যদিও ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে সিসি ব্লক ও জিওব্যাগ ফেলে তীররক্ষা কাজ করেছে, বিশেষজ্ঞদের মতে—নদীর তলদেশে গভীর খাদ তৈরি অব্যাহত থাকলে আসন্ন বর্ষায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেবেব।
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, তিস্তা নদী থেকে অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—এই ‘কঠোরতা’ কবে বাস্তবে রূপ নেবে?
তিস্তা পাড়ের ভুক্তভোগীদের দাবি, অবিলম্বে সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের শনাক্ত করে বিশেষ ক্ষমতায় মামলা দিয়ে আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় প্রতি বছর নদীভাঙনে নিঃস্ব হওয়া মানুষের সংখ্যা কেবল বাড়তেই থাকবে।
তিস্তা পাড়ের মানুষের আর্তনাদ একটাই—
কথা নয়, এবার কার্যকর পদক্ষেপ চাই—এখনই।






