নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় তিস্তা নদী থেকে দীর্ঘদিন ধরে
অবৈধ পাথর উত্তোলনের একটি প্রভাবশালী চক্র তিস্তা নদীর অভ্যন্তরে বোমা মেশিন বসিয়ে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করে আসছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক সংবাদ প্রকাশের পর প্রশাসন অভিযান শুরু করলেও কার্যত বন্ধ হয়নি এই অবৈধ বাণিজ্য।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অবৈধ পাথরের বিরুদ্ধে একের পর এক যৌথ সাঁড়াশি অভিযান, বিপুল সংখ্যক যন্ত্র ধ্বংস ও জব্দ কার্যক্রম পরিচালিত হলেও থামছে না প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের ঘোষণার পরও নদীর বুকে প্রতিদিনই গভীর গর্ত করে চলছে পাথর লুট। এতে নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করায় চরম উদ্বেগে রয়েছে তিস্তা পাড়ে বসবাসরত মানুষ । অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
সর্বশেষ গত ২৬ ফেব্রুয়ারি দিনব্যাপী দুর্গম চরাঞ্চল পাড়ি দিয়ে পরিচালিত যৌথ অভিযানে পাথর উত্তোলনে ব্যবহৃত ৫টি বোমা মেশিন, ৬টি ইঞ্জিনচালিত শ্যালো মেশিন এবং ১১টি নৌকা ধ্বংস করা হয়। এছাড়া বিপুল পরিমাণ যন্ত্রাংশ জব্দ করা হয়। অভিযান পরিচালিত হয় উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের বার্নির ঘাট, তেলীর বাজার, তিস্তা বাজার ও চরখড়িবাড়ি এলাকায়।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের উপস্থিতি টের পেলেই সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবার নদীর তলদেশে গভীর খাদ তৈরি করে শুরু হয় পাথর উত্তোলন। অভিযানের পরপরেই আবারো আটঘাট বেঁধে জোরেশোরে তিস্তা নদীর বুকে অবৈধ পাথর উত্তোলনে মেতে উঠেছে। সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছে পাথর উত্তোলনকারী মেশিনের। বর্তমানে বিভিন্ন পয়েন্টে ২০ টিরও বেশি বোমা মেশিন বসিয়ে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে মহাসমারহে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরানুজ্জামান ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রওশন কবিরের নেতৃত্বে পরিচালিত এ অভিযানে সহযোগিতা করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (৫১ বিজিবি), ডিমলা থানা পুলিশ ও আনসার ভিডিপি সদস্যরা। প্রশাসনের দাবি, অবৈধ উত্তোলনের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
কিন্তু বাস্তবে এর দৃশ্যমান প্রভাব দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের মতে, অবৈধ পাথর উত্তোলনের কারণে তিস্তার ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। গত বর্ষায় ডিমলা উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের মধ্যে অন্তত ৬টিতে তীব্র নদীভাঙন দেখা দেয়। খালিশা চাপানি ইউনিয়নের ছোট খাতা সুপরিটরি গ্রামে শত শত একর আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে নতুন চ্যানেল সৃষ্টি হয়েছে। বহু পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
এদিকে ভাঙন ঠেকাতে ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে সিসি ব্লক ও বালুভর্তি জিওব্যাগ দিয়ে তীররক্ষা কাজ করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, নদীর অভ্যন্তরে গভীর খাদ করে পাথর উত্তোলন চলতে থাকলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ভাঙন আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
সচেতন মহলের অভিযোগ, প্রতি বছর বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীভাঙন রোধে বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় এসব প্রকল্পও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সংরক্ষিত এলাকায় উত্তোলিত পাথর স্তূপ করে রাখার সুযোগ দিয়ে একটি প্রভাবশালী মহল পরোক্ষভাবে এই অবৈধ বাণিজ্যকে সহায়তা করছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, “অবৈধ পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে এবং কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না।”
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—শুধু যন্ত্র ধ্বংস করলেই কি সিন্ডিকেট বন্ধ হবে? মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও গ্রেপ্তার ছাড়া তিস্তা নদী রক্ষা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন তারা।
এজন্য তারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তিস্তা পাড়ের সর্বস্ব হারানো পরিবারগুলোর দাবি, নদী রক্ষায় অবিলম্বে অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধে কঠোর ও স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।





