কুড়িগ্রাম জেলায় কৃষি ও পরিবেশের তোয়াক্কা না করে গড়ে ওঠা ১০৮টি ইটভাটার মধ্যে ৭০টিই অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এসব ইটভাটার অধিকাংশই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রহীন এবং লোকালয় ও দ্বি-ফসলি কৃষিজমি ঘেঁষে স্থাপিত। বিশেষ করে কুড়িগ্রাম, নাগেশ্বরী, উলিপুর, ও ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় অবৈধ ইটভাটার দৌরাত্ম্য এবং ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি (টপ সয়েল) কাটার মহোৎসব চলায় চরম হুমকির মুখে পড়েছে স্থানীয় কৃষি ও জনস্বাস্থ্য।
জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলার ৯টি উপজেলায় মোট ইটভাটা ১০৮টি, যার মধ্যে মাত্র ৩৮টির বৈধ কাগজপত্র রয়েছে। বাকি ৭০টি ভাটা কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করছে না। নাগেশ্বরী উপজেলায় ২০টির মধ্যে ১৫টি অবৈধ,ভূরুঙ্গামারীতে ৯টির মধ্যে ৬টি অবৈধ,উলিপুরে ২৪ টির মধ্যে ১৬ টি অবৈধ, চিলমারীতে ৬ টির মধ্যে ৩ টি অবৈধ, রৌমারিতে ১৩ টির মধ্যে,৭ টি অবৈধ, রাজীবপুরে ৭ টির মধ্যে ৬ টি অবৈধ, ফুলবাড়ি তে ৬ টির মধ্যে ৫ টি অবৈধ,রাজারহাটে ৬টির মধ্য ১ টি অবৈধ । এই ভাবে সরকারী নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে মহা সমারোহে ইটভাটা গুলি চালিয়ে যাচ্ছে।
অভিযোগ উঠেছে, নাগেশ্বরীর এগারোমাথা এলাকায় কৃষিজমি থেকে রাতের আঁধারে মাটি কাটছে এএন ব্রিকস ও এনবি ব্রিকস। এছাড়া জেবিএল ও টিএমএইচ ব্রিকসও অবাধে মাটি সংগ্রহ করছে। সম্প্রতি জিএস ব্রিকসকে ভ্রাম্যমাণ আদালত জেল-জরিমানা করলেও পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি। অনুরুপ ভাবে উলিপুর উপজেলার তবকপুর, দুর্গাপুর, বুড়াবুড়ী মন্ডলের হাট, কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কেতার মোড় এলাকায় অবস্থিত ইটভাটা গুলি কৃষিজমি থেকে মাটি কাটছে ফলে চরম হুমকির মুখে পড়ছে স্থানীয় কৃষি।
দারিদ্র্যপীড়িত কুড়িগ্রামের প্রান্তিক চাষিরা চরাঞ্চল ও নদীবেষ্টিত জমিতে হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে ফসল ফলান। কিন্তু ইটভাটার বিষাক্ত কালো ধোঁয়া ও কৃষিজমির মাটি লুটের কারণে ফসলের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
অবৈধ এসব কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর যৌথ অভিযান শুরু করেছে। এখন পর্যন্ত জেলার ১৩টি ভাটায় অভিযান চালিয়ে ১২ লাখ ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য জরিমানাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে উলিপুরের এসএম ব্রিকসকে ১ লাখ ৭০ হাজার, এনএম ব্রিকসকে ১ লাখ ৫০ হাজার এবং ভূরুঙ্গামারীর তিনটি ভাটায় ৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় এসব ভাটার কার্যক্রম পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় ইটভাটা মালিকদের একাংশের দাবি, উচ্চ আদালত থেকে তারা তিন মাসের সময় পেয়েছেন। তবে তারা স্বীকার করেছেন যে, পরিবেশ অধিদপ্তর ও কাস্টমস সহ বিভিন্ন দপ্তরে অলিখিত ‘মাসোহারা’ দিয়েই তারা কার্যক্রম চালাচ্ছেন।
নাগেশ্বরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শারমিন জাহান লুনা জানান, ফসলি জমি রক্ষা ও অবৈধ ভাটা বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথও জানিয়েছেন, নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
উলিপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার ( ভুমি) এস এম মেহেদী হাসান জানান, ফসলি জমি রক্ষা ও অবৈধ ভাটা বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথও জানিয়েছেন, নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এব্যাপারে কুড়িগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক এর সাথে কথা হরে তিনি জনান অনেক অবৈধ ভাটা মালিক আদালতের রিট দেখিয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছেন। তবে আইন অমান্য করে ফসলি জমির মাটি কাটা বা পরিবেশ দূষণ সহ কৃষি জমির ক্ষতি করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”
রংপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক নুর আলম বলেন, “কুড়িগ্রামের অনেক অবৈধ ভাটা মালিক আদালতের রিট দেখিয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছেন। তবে আইন অমান্য করে ফসলি জমির মাটি কাটা বা পরিবেশ দূষণ করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”