রাজবাড়ীর ঐতিহ্যবাহী গোয়ালন্দ বাজারে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড যেন পুরো ব্যবসায়ী সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছে। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) রাত সাড়ে ১০টার দিকে কুকারিজ মার্কেট থেকে শুরু হওয়া এই আগুন মুহূর্তের মধ্যেই লেলিহান শিখায় রূপ নিয়ে তিনটি দোকানকে গ্রাস করে নেয়। আগুনের ভয়াবহতায় পুরো বাজারে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক, বন্ধ হয়ে যায় স্বাভাবিক ব্যবসা কার্যক্রম।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা হলেন মো. খোকন মন্ডল, মো. হারুন অর রশিদ ও মো. লুৎফর রহমান। তাদের দাবি, নগদ অর্থ, মূল্যবান মালামাল ও দোকানের সরঞ্জামসহ ক্ষতির পরিমাণ কমপক্ষে ৫ কোটি টাকা। চোখের সামনে সর্বস্ব পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার দৃশ্য মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছে ব্যবসায়ীদের।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রথমে মো. খোকন মন্ডলের কুকারিজ দোকান থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়। বাজারের সংকীর্ণ গলি, দাহ্য পণ্যের আধিক্য ও পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার অভাবে আগুন দ্রুত পাশের আরও দুই দোকানে ছড়িয়ে পড়ে। ব্যবসায়ীরা নিজ উদ্যোগে আগুন নেভানোর চেষ্টা করলেও পর্যাপ্ত সরঞ্জামের অভাবে তা ব্যর্থ হয়।
খবর পেয়ে গোয়ালন্দ ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পরে রাজবাড়ী থেকে আরও দুটি ইউনিট যোগ দেয়। স্থানীয়দের সহায়তায় প্রায় দেড় ঘণ্টার প্রাণপণ চেষ্টার পর রাত সাড়ে ১১টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে ততক্ষণে তিনটি দোকান সম্পূর্ণভাবে ভস্মীভূত হয়ে যায়।
আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ব্যবহৃত পানিতে পাশের চাল বাজারের একাধিক আড়তের শত শত বস্তা চাল ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন চাল ব্যবসায়ীরা। এতে পরোক্ষভাবে আরও কয়েক লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী মো. খোকন মন্ডল বলেন, “প্রতিদিনের মতো রাত ১০টার দিকে দোকান বন্ধ করে বাড়ি যাই। কিছুক্ষণ পর ফোন পেয়ে এসে দেখি আমার জীবনের সবকিছু আগুনে পুড়ে শেষ।” তার কণ্ঠে ছিল অসহায়ত্ব ও ক্ষোভ।
গোয়ালন্দ বাজার ব্যবসায়ী পরিষদের সভাপতি মো. ছিদ্দিক মিয়া বলেন, “এই অগ্নিকাণ্ড শুধু তিনজন ব্যবসায়ীকে নয়, পুরো বাজার ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় এমন ঘটনা বারবার ঘটছে।”
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. সাহিদুল ইসলাম, গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাথী দাস, গোয়ালন্দ ঘাট থানার ওসি মো. মমিনুল ইসলামসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধান ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ শুরু হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাথী দাস জানান, “অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সহায়তায় প্রশাসন সাধ্যমতো পাশে থাকবে।”
এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড আবারও প্রশ্ন তুলেছে—গোয়ালন্দের মতো ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ বাজারে কেন এখনো আধুনিক অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই? তদন্তের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে আছে সর্বস্ব হারানো ব্যবসায়ী ও পুরো বাজারবাসী।