ঝালকাঠির প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘শাটডাউন’ কর্মসূচির কারণে পড়াশোনায় সবথেকে বড় ধাক্কা: শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ থেকে এবং অভিভাবকদের উদ্বেগ বাড়ছে; মন্ত্রণালয় রয়েছে কঠোর অবস্থানে
ঝালকাঠি, কাঠালিয়া: সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য নিরসনসহ তিন দফা দাবির প্রেক্ষিতে ঝালকাঠির কাঠালিয়া উপজেলায় আন্দোলন চলছে এবং এ পরিস্থিতি অভিভাবকদের কাছে গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই আন্দোলনের অংশ হিসেবে শিক্ষকদের ঘোষণা করা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির দৌলতে কিছু বিদ্যালয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক পরীক্ষার সময় প্রধান শিক্ষকরা পরীক্ষা নিচ্ছিলেন এবং অন্যদিক সহকারী শিক্ষকরা ক্লাস বর্জন করে কর্মবিরতিতে অংশ নিচ্ছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে স্থবিরতা ও বিপর্যয় নেমে এসেছে এবং অভিভাবকদের মধ্যে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
শিক্ষকদের আন্দোলনের অংশ হিসাবে, ঝালকাঠি জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি এবং সহকারী শিক্ষক সমিতির জরুরি সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ০৪/১২/২০২৫ তারিখে জেলায় ‘সম্পূর্ণ শাটডাউন’ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। এই কর্মসূচির মূল সিদ্ধান্তগুলোতে ঝালকাঠি জেলার সকল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সম্পূর্ণ শাটডাউন পালন করা, উপজেলাধীন কোনো বিদ্যালয় খোলা না রাখা, শুধু অফিস কক্ষ খোলা রাখার কথা প্রচারিত হয়েছিলো। প্রধান শিক্ষক এবং দপ্তরি শিক্ষক ফাঁকা সময়ে শিক্ষার্থীদের টিফিন গ্রহণ ও বিতরণের দায়িত্ব পালন করছেন এবং তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। এই পরিস্থিতিতে, প্রধান শিক্ষক যদি বিদ্যালয় খোলা রাখার চেষ্টা করেন বা পরীক্ষা নিতে চান, তাহলে সহকারী শিক্ষকরা তাদের বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করছেন।
এমন পরিস্থিতিতে কাঠালিয়ার ৪৯ নং মধ্য কৈখালী প্রাথমিক বিদ্যালয়, বিনাপানি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং কানাইপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দেখা যায় যে সকালে বিদ্যালয়ের গেটে তালা দেওয়া থাকলেও পরে তা খুলে দেওয়া হয়েছে। কিছু স্থানে প্রধান শিক্ষকরা পরীক্ষা নিলেও, সহকারী শিক্ষকরা ক্লাস না নিয়ে অফিস কক্ষে বসে আছেন। আন্দোলনরত শিক্ষকরা ঘোষণা করেছেন, “আমরা আজ কাঠালিয়া উপজেলার সকল স্কুলে শাটডাউন পালন করবো। ইনশাআল্লাহ। ঝালকাঠি জেলা ও কাঠালিয়া উপজেলার সহকারী শিক্ষকই নেতা—আপনার অধিকার আদায়ে আপনিও সোচ্চার।”
অন্যদিকে, অভিভাবক মহলে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে, কারণ শিক্ষকদের এমন আন্দোলনের ফলে বার্ষিক পরীক্ষার মাঝখানে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের মনোবলে অধেকা হচ্ছে। কাঠালিয়া উপজেলার বাসিন্দা ও অভিভাবক জাহিদ হোসেন প্রকাশ করেছেন যে এই পরিস্থিতি শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার প্রতি নিরুৎসাহিত করছে। অভিভাবক সোহাগ হাং শিক্ষকদের এমন সিদ্ধান্তকে “জাতির জন্য হুমকিস্বরূপ” বলেই মনে করেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে যারা কোমলমতি শিশুদের নৈতিক শিক্ষা দেন, তাদের এমন আন্দোলন শিক্ষার্থীদের শিক্ষার প্রতি নিরুৎসাহিত করছি। তিনি অভিযোগ করেন যে সর্বোচ্চ সংখ্যক সরকারি ছুটি পাওয়া এবং অধিকাংশ শিক্ষক নিজ উপজেলায় চাকরি করার সুবিধা পাওয়ার পরও শিক্ষকদের এমন আন্দোলনের কোনও সমর্থনযোগ্যতা নেই। শিক্ষকরা তাদের চাকরির শর্তাবলী বুঝে নিয়ে কাজ শুরু করলেও এখন তারা উচ্চতর গ্রেড চেয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান বন্ধ রেখে নিজেদের অধিকার আদায়ের চেষ্টায় রত আছেন এবং সেই কারণে তাদের এই আচরণ চাকরি বিধি লঙ্ঘন। তিনি দ্রুত এ সমস্যার সমাধানের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে শিক্ষা পরলভা ঘোষণার পরিপেক্ষিতে সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা আবদুল্লাহ শিবলী সাদিক শিক্ষকদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন কঠোর বার্তা। মন্ত্রণালয় স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছে যে সহকারী শিক্ষকদের কর্মবিরতি ও পরীক্ষা বর্জনের কর্মসূচি প্রত্যাহার করে কাজে যোগদানের জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। ‘কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিয়ে এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মসূচি গ্রহণ সরকারের চাকরি আইন, আচরণ বিধিমালার পরিপন্থী, এমন অভিযোগে শিক্ষকদের ফৌজদারি আইনে মামলা হতে পারে এবং কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এছাড়াও, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর জানিয়েছে, বর্তমানে ডিআই (Directorate of Inspection) এর তদন্ত অনুযায়ী ১১৭২ জন শিক্ষকের জাল সনদের তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নিতে খুব শীঘ্রই সামনে এগোবে বলে জানা যাচ্ছে এবং অনুসন্ধান হতে অনুপস্থিত পরিসংখ্যানের কারণে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে সম্প্রতি সচেতন মহল থেকে বিভিন্ন দাবি ও প্রস্তাব উঠেছে। যেমন, কিছুজন প্রস্তাবনা করেছেন যে বন্ধ হয়ে যাওয়া স্কুলগুলো নিয়ে পরিবর্তন করা উচিত এবং বরং কিন্ডারগার্টেন এবং নূরানি মাদ্রাসাগুলোকে সরকার কর্তৃক পরিচালিত করা উচিত। তারা আরও বলছেন যে অন্যান্য সরকারি চাকরির মতো, প্রাথমিক শিক্ষকদেরও নিয়মিত বদলির ব্যবস্থা পূর্ববর্তী রীতি বজায় রাখা উচিত।