মায়ের উদাসিনতা ও সমাজের কিছু অসাধু ব্যক্তির কুমতলবের কারণে দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর অনেক শিশু অল্প বয়সেই বিয়ের ফাঁদে পড়ছে। বিয়ের পর সংসার টিকছে না, ফলে তাদের বড় একটি অংশ আবার ফিরে আসছে পল্লীতেই বাধ্য হয়ে জড়িয়ে পড়ছে যৌনপেশায়।
স্থানীয় সমাজকর্মী ও অধিকারকর্মীরা বলছেন, যৌনপল্লীর শিশুদের ভবিষ্যৎ এখনো অন্ধকারে। অল্প বয়সেই অনিরাপদ সম্পর্ক, ভুয়া বিয়ের প্রলোভন, কিংবা পরিবারের দায় এড়িয়ে দেওয়ার মানসিকতা সবকিছু মিলেই তাদের জীবনের গতিপথ বিপথগামী হচ্ছে।
একজন সমাজকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“অনেক মা নিজের অজান্তে বা কখনো কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে মেয়েদের বিয়ের নাম করে পাঠিয়ে দেন, যেন বোঝা কমে। কিন্তু সেই ‘বিয়ে’ বেশিরভাগ সময়ই হয় প্রতারণামূলক। মেয়েরা কিছুদিন পরই পরিত্যক্ত হয় এবং পরে যৌনপল্লীতেই ফিরে আসে।”
পল্লীর এক কিশোরী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়,
আমার যখন বিয়ে হয় তখন আমার বয়স ছিল ১৫ বছর আর আমার বরের বয়স ছিল ৩০ বছরের বেশী। বছর না ঘুরতে ঘুরতেই সে আমাকে ছেড়ে চলে যায়। আমি একা কি করবো, মা তার কাছে আমাকে আর জায়গা দিতে চাচ্ছে না কারণ সেতো যৌনপল্লীর ভিতরে বসবাস করে আর আমাদের তো নিজস্ব কোন বাড়ি নেই অথবা থাকার কোন জায়গা নেই পরবর্তীতে মায়ের চাপে যৌনপশায় আসতে বাধ্য হয়েছি।
এছাড়া যে সব মেয়েরা বিভ্ন্নি সেফ হোমে থেকে নিরাপদে বসবাস করছে, লেখাপড়া করছে তারা একটু বড় হলেই তাদের মায়েরা বিভ্ন্নি অযুহাতে সেফ হোম থেকে শিশুদের বেড়ানোর নাম করে নিয়ে আসে। পরবর্তীতে সেফ হোমের কোন কর্মকর্তাদের না জানিয়ে তারা মেয়েদের বয়স বাড়িয়ে নোটারীর মাধ্যমে তাদের বিয়ে দিয়ে থাকে। কিন্তু সেফহোম কর্তৃপক্ষ শত চেষ্টা করেও ঐসব মেয়েদের আর উদ্ধার করতে পারে না।
এ বিষয়ে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোঃ রুহুল আমীন বলেন, বাল্যবিবাহ সমাজে একটি ব্যধিতে পরিনত হয়েছে। তবে আগের তুলনায় এখন অনেকটা কম। এখনও যে গুলো হচ্ছে সেগুলো লোকচক্ষুর আড়ালে। এখানে পরিবারের আগে সচেতন হতে হবে। পরিবার , সমাজ এবং যে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করে তারা এ বিষয়ে সচেতেনতা বৃদ্ধি করে এ সমস্যার সমাধান হবে। সর্বোপরী সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং পরিবার সচেতেন হলে বাল্যবিবাহ রোধ করা সম্ভাব হবে। যৌনপল্লীর মায়েদের এ বিষয়ে কাউন্সেলিং করা প্রয়োজন। মায়েরা সচেতন হলে বাল্যবিবাহ রোধ করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা সালমা বেগম বলেন, আমাদের দেশে এখনও যে বাল্যবিবাহ হচ্ছে তা সচেতনতার অভাবে। অভিবাবকদের বোঝানোর পরে ও তারা লুকিয়ে এ বাল্যবিবাহ দিয়ে থাকে তা আমরা সহ কেহই জানেনা। তাছাড়া নোটারীর মাধ্যমে যে বাল্যবিবাহ হয় তা বৈধ নয়। যদি আমরা জানতে পারি বা কোন বেসরকারী সংস্থা যদি আমাদের অবহিত করে যে কোথাও বাল্যবিবাহ হচ্ছে তা হলে আমরা ইউএনও স্যারের সহযোগীতায় মহিলা বিষয়ক, সমাজসেবা, থানার মাধ্যমে তা প্রতিরোধ করে থাকি। সর্বোপরি সকলের সচেতনতা বিশেষকরে পরিবারকে সচেতন করলে এ বাল্যবিবাহের হাত থেকে শিশুদের রক্ষা করা যাবে। এছাড়া যৌনপল্লীর যে শিশুরা আছে তাদের মায়েদের সচেতন করা হলে বাল্যবিবাহ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
এমন ঘটনার পেছনে শিক্ষার অভাব, সামাজিক অবহেলা, আইনি সচেতনতার অভাব এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের নীরবতা বড় কারণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।