ঢাকার উপকণ্ঠের শিল্পাঞ্চল সাভার ও আশুলিয়া এলাকায় দিন দিন বেড়েই চলছে মশার উপদ্রব। সন্ধ্যা নামলেই বাসা-বাড়ি, দোকানপাট ও রাস্তাঘাটে অসহনীয় হয়ে ওঠে মশার আক্রমণ। এতে করে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে, পাশাপাশি বাড়ছে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো রোগের আশঙ্কা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ড্রেন-খাল দখল, অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ ও জমে থাকা পানির কারণেই মশার বংশবিস্তার বাড়ছে। সাভার পৌর এলাকার বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “প্রতিদিন সন্ধ্যার পর মশার কয়েল ও স্প্রে ব্যবহার করেও রেহাই মিলছে না। ছোট বাচ্চাদের নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি। গত বছর আমাদের এলাকায় কয়েকজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন।”
আশুলিয়ার নয়ারহাট এলাকার গৃহিণী সালমা বেগম জানান, “মশার কারণে রাতে ঘুমানো যায় না। বিদ্যুৎ চলে গেলে তো অবস্থা আরও খারাপ হয়। কয়েল জ্বালালে বাচ্চাদের শ্বাসকষ্ট হয়, আবার না জ্বালালেও মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হতে হয়।”
স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও একই অভিযোগ তুলেছেন। আশুলিয়ার জামগড়া এলাকার দোকানদার শহীদুল ইসলাম বলেন, “সন্ধ্যার পর দোকানে ক্রেতা কমে যায়। সবাই তাড়াতাড়ি বাসায় চলে যেতে চায়। মশার জন্য বসে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।”
স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশই এই সমস্যার মূল কারণ। সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “যেখানে পানি জমে থাকে, সেখানেই এডিস মশা বংশবিস্তার করে। বাসাবাড়ির ছাদ, টব, নির্মাণাধীন ভবনের বেসমেন্ট—সব জায়গায় নিয়মিত নজরদারি দরকার। শুধু পৌরসভার ওপর দায় চাপিয়ে দিলে হবে না, নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে।”
তবে এলাকাবাসীর দাবি, নিয়মিত ও কার্যকর ফগিং কার্যক্রম চোখে পড়ে না। সাভারের ব্যাংক কলোনির বাসিন্দা শিক্ষক মাহবুবুর রহমান বলেন, “কখনো কখনো ফগিং গাড়ি আসে, কিন্তু সেটা খুবই অনিয়মিত। তাছাড়া দিনের বেলায় ফগিং করলে তেমন কোনো ফল পাওয়া যায় না। সন্ধ্যার আগে বা পরে করলে হয়তো বেশি কার্যকর হতো।”
পরিবেশ সচেতন সংগঠনের কর্মী তানভীর হাসান বলেন, “শিল্পাঞ্চল হওয়ায় এখানে প্রচুর কারখানা ও আবাসিক ভবন গড়ে উঠেছে। কিন্তু সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নেই। ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত না করলে মশার উপদ্রব কমানো কঠিন। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার।”
এদিকে শিক্ষার্থীরাও ভোগান্তির কথা জানিয়েছে। আশুলিয়ার একটি কলেজের ছাত্রী নুসরাত জাহান বলেন, “ক্লাস শেষে কোচিংয়ে যেতে হয়। সন্ধ্যার সময় রাস্তায় দাঁড়ানো যায় না মশার জন্য। অনেক সময় হাত-পা ফুলে যায় কামড়ে।”
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এক প্রতিনিধি জানান, মশা নিধনে নিয়মিত ওষুধ ছিটানো হচ্ছে এবং ড্রেন পরিষ্কারের কাজ চলছে। তবে জনবল ও সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, “আমরা চেষ্টা করছি। নাগরিকদেরও নিজেদের বাসা ও আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল ফগিং বা কয়েল ব্যবহার করে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ—ড্রেন ও খাল পরিষ্কার রাখা, জমে থাকা পানি অপসারণ, নিয়মিত নজরদারি এবং সচেতনতামূলক প্রচারণা। একই সঙ্গে নির্মাণাধীন ভবনে পানি জমে আছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি।
সব মিলিয়ে সাভার ও আশুলিয়াবাসীর প্রত্যাশা, দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে মশার উপদ্রব থেকে স্থায়ী মুক্তি মিলুক। নইলে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও দৈনন্দিন দুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সাধারণ মানুষের যৌথ উদ্যোগ কতটা দ্রুত বাস্তবায়িত হয়।





