বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক এবং প্রথিতযশা সাংবাদিক নিমাই ভট্টাচার্য। যিনি তাঁর কলমের জাদুতে সাধারণ মানুষের জীবনবোধ আর সাংবাদিকতার পেশাদারিত্বকে এক সুতোয় গেঁথেছিলেন। কালজয়ী উপন্যাস ‘মেমসাহেব’-এর স্রষ্টা হিসেবে তিনি পাঠকহৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছেন।
জন্ম ও শৈশব:
নিমাই ভট্টাচার্য ১৯৩১ সালের ১০ এপ্রিল তৎকালীন যশোর জেলার মাগুরা মহকুমার শালিখা থানার শরশুনা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবটা তাঁর খুব একটা সুখের ছিল না; মাত্র তিন বছর বয়সেই তিনি মাতৃহীন হন। তাঁর পিতার নাম সুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য।
শিক্ষাজীবন:
তিনি ১৯৪৮ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। দেশভাগের পর তিনি পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন এবং কলকাতার রিপন কলেজে (বর্তমান সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) ভর্তি হন। সেখান থেকেই তিনি উচ্চ মাধ্যমিক এবং পরবর্তীতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।
পেশাগত জীবন (সাংবাদিকতা):
নিমাই ভট্টাচার্যের কর্মজীবনের শুরু হয়েছিল সাংবাদিকতার হাত ধরে। তিনি দীর্ঘ পঁচিশ বছর দিল্লিতে ভারতীয় সংবাদপত্রের রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সংসদীয় সাংবাদিক হিসেবে সুনামের সাথে কাজ করেছেন। সাংবাদিক হিসেবে তিনি ভারতের একাধিক প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়ে বিদেশ ভ্রমণ করেছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ঘটনাবলী কভার করেছেন।
সাহিত্যিক জীবন ও উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি:
সাংবাদিকতার ব্যস্ততার মাঝেই ১৯৬৩ সালে কলকাতার সাপ্তাহিক ‘অমৃতবাজার’ পত্রিকায় তাঁর প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হয়। প্রথম উপন্যাসেই তিনি ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেন। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা দেড়শোরও বেশি।
তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং জনপ্রিয় উপন্যাস হলো ‘মেমসাহেব’। ১৯৭২ সালে এই উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন মহানায়ক উত্তম কুমার ও অপর্ণা সেন। তাঁর লেখা অন্যান্য জনপ্রিয় বইগুলোর মধ্যে রয়েছে:
মিনিবাস, মাতাল, ইনকিলাব, ব্যাচেলার।
ইমনকল্যাণ, প্রবেশ নিষেধ, কেরানী, হকার্স কর্নার।
রাজধানী এক্সপ্রেস, নিমন্ত্রণ, নাচনী, অ্যাংলো ইন্ডিয়ান।
আকাশ ভরা সূর্য তারা, মোগল সরাই জংশন এবং প্রিয়বরেষু।
ব্যক্তিগত জীবন:
তিনি বাংলাদেশের বগুড়া জেলার কালীতলার বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর কন্যা দীপ্তি ভট্টাচার্যকে বিবাহ করেন। জীবনের পরবর্তী দীর্ঘ সময় তিনি কলকাতার টালিগঞ্জের শাশমল রোডের বাসভবনে অতিবাহিত করেন।
প্রয়াণ:
বাংলা সাহিত্যের এই নিভৃতচারী কলম সৈনিক ২০২০ সালের ২৫ জুন ইহলোক ত্যাগ করেন। তাঁর সহজ-সরল বর্ণনাভঙ্গি এবং বাস্তবমুখী কাহিনীর মাধ্যমে তিনি আজও কোটি বাঙালির হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন।





