উপকূলীয় জেলা ভোলার দৌলতখান উপজেলায় মুরগির খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় তৈরি হয়েছে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। লেয়ার মুরগির বিষ্ঠা ব্যবহার করে বায়োগ্যাস উৎপাদনের মাধ্যমে নিজের পরিবারসহ আশপাশের আরও অন্তত ১৫টি পরিবারে রান্নার গ্যাস সরবরাহ করছেন খামারি রাকিব। এতে যেমন পরিবেশ দূষণ কমছে, তেমনি গ্রামীণ এলাকায় জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় খুলে যাচ্ছে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার।
জানা গেছে, ভোলার দৌলতখান উপজেলার মেদুয়া ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা মোঃ সগির আহম্মেদ রাকিব। তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রায় দুই হাজার লেয়ার মুরগির খামার পরিচালনা করে আসছেন। তার খামার থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ হাজার ৮৫৫টি ডিম উৎপাদিত হলেও, মুরগির বিষ্ঠার সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় দুর্গন্ধ ও পরিবেশগত সমস্যায় ভুগতে হতো তাকে। এছাড়া আশপাশের বাসিন্দাদেরও ছিল নানা অভিযোগ।
রাকিব জানান, খামারের বর্জ্য থেকে সৃষ্ট তীব্র দুর্গন্ধের কারণে সামাজিক ও পারিবারিক নানা অস্বস্তির মুখে পড়তে হতো তাকে। এমনকি আত্মীয়-স্বজনও বাড়িতে থাকতে চাইতেন না। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ দেখায় বিশ্ব ব্যাংক ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর স্মার্ট পোল্ট্রি প্রকল্প। প্রকল্পটির আওতায় কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থা (জিজেইউএস)-এর পরামর্শে তিনি খামারে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপন করেন।
জিজেইউএস-এর সহকারী পরিচালক তরুণ কুমার পাল বলেন, লেয়ার মুরগির বিষ্ঠায় নাইট্রোজেনের পরিমাণ বেশি থাকায় তা দ্রুত গ্যাস উৎপাদনে সহায়ক। তিনি আরও জানান, আমাদের প্রকল্পের মূল লক্ষ্য সম্পদ সাশ্রয়ী উৎপাদন ও বর্জ্যের সঠিক ব্যবহার। এরই ধারাবাহিকতায় খামারিদের বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপন ও প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে এই প্ল্যান্ট থেকে উৎপাদিত বায়োগ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে রাকিবের নিজের পরিবারের পাশাপাশি আশপাশের প্রায় ১৫টি পরিবার রান্নার কাজে ব্যবহার করছে।
বায়োগ্যাস ব্যবহারকারী মমতাজ বলেন, আগে সিলিন্ডার গ্যাসে রান্না করতাম। সব সময় গ্যাস শেষ হয়ে যাওয়ার দুশ্চিন্তা থাকত। এখন সে টেনশন নেই।
একই এলাকার বাসিন্দা কুলসুম বলেন, বায়োগ্যাস ব্যবহারের পর রান্নায় সময় কম লাগে, খরচও আগের তুলনায় অনেক কমেছে।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য কামরুল ইসলাম বলেন, গ্রাম এলাকায় লাইনের মাধ্যমে গ্যাস পাওয়া যাবে এটা কখনো কল্পনাও করিনি। এই উদ্যোগ আমাদের এলাকার জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
রাকিবের সাফল্য আশপাশের খামারিদের মাঝেও আগ্রহ তৈরি করেছে। লেয়ার খামারি কামরুনাহার বলেন, আমার খামারে এক হাজার লেয়ার মুরগি আছে। বিষ্ঠা নিয়ে সব সময় সমস্যায় থাকি। এমন বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট করতে পারলে সমস্যার বড় অংশই কমে যাবে।
ভোলা সদর উপজেলার শিবপুর এলাকার সাদিয়া এগ্রো ফার্মের স্বত্বাধিকারী মাওলানা মনিরুল ইসলাম বলেন, বায়োগ্যাস একটি কার্যকর উদ্যোগ। এতে পরিবেশ দূষণ কমানোর পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং খামারিদের দীর্ঘদিনের বর্জ্য সমস্যার সমাধান সম্ভব।
জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডা. রফিকুল ইসলাম খান বলেন, গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থার এ ধরনের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। খামারিরা যদি আরও বেশি করে এগিয়ে আসেন, তাহলে পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি তারাও অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিতভাবে পোল্ট্রি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বায়োগ্যাস উৎপাদন উপকূলীয় ও গ্রামীণ এলাকায় জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ক্যাপশন :
ছবি-১ : দৌলতখান উপজেলার মেদুয়া ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা মোঃ সগির আহম্মেদ রাকিবের বায়ো গ্যাসের ছবি।
ছবি-২ : বায়োগ্যাস ব্যবহার করে গৃহস্থালী রান্নার কাজ করছেন মমতাজ বেগম নামের গৃহবধূ।





