উপকূলের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে এখন ব্যস্ততার ভিন্ন এক চিত্র। মাঠের পর মাঠজুড়ে রোদে বিছানো ছোট মাছ, চিংড়ি ও চেউয়া-দূর থেকে দেখলে মনে হয় প্রকৃতি যেন সোনালি কার্পেট পেতে দিয়েছে। মৌসূম প্রায় শেষের পথে, আর কয়েক সপ্তাহ পরই আবহাওয়ার পরিবর্তণ। তাই রোদের প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগাতে নারী-পুরুষ শ্রমিকরা দিনভর নিরলস পরিশ্রম করছেন।
চরফ্যাশন উপজেলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ঢালচরের বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, নদী থেকে ট্রলারে ট্রলারে মাছ আসছে কিনারায়। শ্রমিকরা সেগুলো ধুয়ে পরিষ্কার করছেন। কেউ চিংড়ি, চেউয়া ও ছোট মাছ আলাদা করছেন। আবার কেউ বাঁশের চাটাই বা জাল শিটের ওপর মাছ সারি করে বিছিয়ে দিচ্ছেন, কেউ রোদে শুকাচ্ছেন, কেউ মাছ উল্টাচ্ছেন, কেউ মাছ আলাদা করছেন, কেউ বস্তাবন্দি করছেন। সূর্য ডোবার আগেই দিনের উৎপাদন গুছিয়ে রাখার তাড়া সবার মাঝে। শুঁটকি উৎপাদনে নারীর অংশগ্রহণ বিশেষভাবে লক্ষ্য করা গেছে। অনেক গৃহিণী মৌসূমে বাড়তি আয়ের আশায় এই কাজে যুক্ত হয়েছেন এবং পুরুষদের সঙ্গে সমানতালে কাজ করছেন তারা।
স্থানীয় জেলে ছালাউদ্দিন জানান, গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর চেউয়া মাছ বেশি পাওয়া যাচ্ছে মেঘনায়। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে। নদী থেকে মাছ ধরে চড়েই শুকানো হয়। আর দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা এসে সরাসরি কিনে নিয়ে যান। এই মৌসূমে কয়েক লাখ টাকার লেন-দেন হবে বলে আশা করছেন তিনি।
মাঝি হারুন পন্ডিত বলেন, ঢালচরে শুঁটকি উৎপাদন পুরোপুরি প্রাকৃতিক রোদ নির্ভর। আধুনিক ড্রায়ার বা উন্নত সংরক্ষণব্যবস্থা না থাকায় হঠাৎ বৃষ্টি, অতিরিক্ত আর্দ্রতা বা ঝড়ো হাওয়ায় বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে বিশেষ করে মৌসূমের শেষ দিকে।
শুঁটকি উৎপাদনে নিয়োজিত শ্রমিক আলমগীর বেপারী ও নারী শ্রমিক বিধবা রেনু বেগম জানান, মৌসূমে প্রতিদিন সকালে মাছ নিয়ে কাজ শুরু হয়। রোদে শুকানো থেকে শুরু করে আলাদা করা ও বস্তা বন্দি; সব কাজই করেন তারা। প্রতিটি উৎপাদন কেন্দ্রে গড়ে ১০-১২ জন শ্রমিক কাজ করেন। কেউ দৈনিক ৭০০-৮০০ টাকা মজুরিতে, কেউ মৌসূমি চুক্তিতে। এই কয়েক মাসের আয়ই অনেক পরিবারের সারা বছরের ভরসা।
ঢালচরের শুঁটকি আড়ৎদার শাহে আলম ফরাজি বলেন, এ বছর ঢালচরের শুঁটকি ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার লেনদেন হচ্ছে। পাইকারদের কাছে চিংড়ির শুঁটকি মণ প্রতি-৬ থেকে ৭ হাজার টাকা, মাটিতে শুকনো চেউয়া ১৬০০ থেকে ১৮০০ টাকা, এবং জাল শিটের ওপরে শুকনো চেউয়া মাছের প্রতিমণ ৩০০০ থেকে ৩৫০০ টাকায় বিক্রি করছি ব্যবসায়ীদের কাছে। তিনি আরও বলেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর জেলে ও উৎপাদকরা লাভবান হবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তবে আধুনিক সংরক্ষণ ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা গেলে বাজার আরও সম্প্রসারিত হবে এবং রপ্তানির সুযোগ বাড়বে।
চরফ্যাশন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, ঢালচরের শুঁটকি খাতকে আমরা আরও আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করতে কাজ করছি। উৎপাদকদের কেমিক্যালমুক্ত, স্বাস্থ্য সম্মত ও উন্নত পদ্ধতিতে শুঁটকি উৎপাদনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। মান সম্মত উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে এই খাত উপকূলের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখবে এবং জেলে ও শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।






