জীবনের শেষ বয়সটা সাধারণত কাটে নাতি-নাতনির হাসি, পরিবারের সান্নিধ্য আর একটু বিশ্রামে। কিন্তু সবার ভাগ্যে সেই শান্তি জোটে না। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আমনুরা পাওলি প্রশিকা পাড়ার বাসিন্দা মোঃ নওশাদ আলীর (৮৪) জীবনের গল্প যেন ঠিক তার উল্টো—একাকীত্ব, দারিদ্র্য আর নিরন্তর সংগ্রামের এক নির্মম বাস্তবতা।
তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা এই মানুষটি পেশায় একজন রিকশাচালক। ছোটবেলা থেকেই অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছেন। সংসার গড়েছিলেন, স্বপ্ন দেখেছিলেন সন্তানদের নিয়ে সুখে-শান্তিতে বাঁচবেন। তার পরিবারে ছিল ৪ ছেলে ও ৫ মেয়ে। কিন্তু ভাগ্যের নিষ্ঠুর খেলায় একে একে সব সন্তানই মৃত্যুবরণ করেছেন। আজ তিনি সম্পূর্ণ একা—নেই পাশে কোনো সন্তান, নেই দেখভালের কেউ।
বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে, চোখে ঝাপসা দেখে, হাঁটতেও কষ্ট হয়—তবুও থেমে থাকার সুযোগ নেই। ভোরের আলো ফোটার আগেই পুরোনো রিকশাটা নিয়ে বের হয়ে পড়েন রাস্তায়। দিনভর কষ্ট করে রিকশা চালিয়ে যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনোমতে নিজের খাবার আর ওষুধের খরচ চালান। কখনো যাত্রী মেলে, কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। তবুও হাল ছাড়েন না।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয়—অল্প শিক্ষিত হলেও তিনি একজন সচেতন মানুষ। প্রতিদিন নিজের টাকায় দৈনিক পত্রিকা কিনে পড়েন। দেশের খবর, সমাজের খবর জানতে তার আগ্রহ এখনও অটুট। বয়স তাকে থামাতে পারেনি, জীবন তাকে হার মানাতে পারেনি।
দুঃখজনক হলেও সত্য, এত দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের পরও কোনো সরকারি ভাতা, বয়স্ক সহায়তা কিংবা বেসরকারি আর্থিক অনুদান—কিছুই জোটেনি তার ভাগ্যে। সমাজের চোখের সামনে একজন বৃদ্ধ মানুষ প্রতিদিন জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন, অথচ তার পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই।
স্থানীয়দের ভাষায়, “এই বয়সে রিকশা চালানো খুব কষ্টের। উনার জন্য একটু সাহায্য হলে অন্তত শেষ জীবনটা শান্তিতে কাটাতে পারতেন।”
সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এলাকাবাসীর একটাই দাবি—মোঃ নওশাদ আলীর মতো অসহায়, সন্তানহারা ও কর্মক্ষমতা হারাতে বসা প্রবীণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো হোক। মানবিক সহায়তা, বয়স্ক ভাতা বা আশ্রয়ের ব্যবস্থা করলে হয়তো তার শেষ বয়সটা কিছুটা স্বস্তিতে কাটবে।



