ভোলা সদর উপজেলার শিবপুর এলাকা থেকে নয় মাস বয়সী সন্তান তাহসিফকে নিয়ে ভোলা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে এসেছেন মুক্তা বেগম। হাম রোগে আক্রান্ত শিশুটিকে গত ২৬ মে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। তবে ভর্তি হওয়ার পরও নিয়মিত চিকিৎসক পাননি বলে অভিযোগ তার। মুক্তা বেগম বলেন, একদিন ডাক্তার এসে কিছুক্ষণ দেখে গেছেন, কিন্তু পরে আর নিয়মিত দেখা পাইনি। বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ করেন ভোলার ওয়েস্টার্ণ পাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. হাসান। তিনি বলেন, ঈদের দুই দিন আগে অসুস্থ সন্তানকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন। কয়েক দিনে মাত্র একবার চিকিৎসকের দেখা পেয়েছেন, সেটিও খুব অল্প সময়ের জন্য। তার দাবি, শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি অধিকাংশ রোগীর স্বজন একই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।
সোমবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, দ্বীপজেলা ভোলার সবচেয়ে বড় সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ভোলা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বহির্বিভাগ ও বিভিন্ন ওয়ার্ডে রোগীর চাপ থাকে। তবে হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে অপরিচ্ছন্নতা, ময়লা-আবর্জনা ও দুর্গন্ধের চিত্রও চোখে পড়ে। বিশেষ করে টয়লেটগুলোর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রোগী ও স্বজনরা।
ভেদুরিয়া টেকেরহাট এলাকা থেকে আসা রোগীর স্বজন নয়ন তারা বলেন, হাম ওয়ার্ডের টয়লেট শত শত রোগী ও স্বজনরা ব্যবহার করলেও নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। দুর্গন্ধে সেখানে যাওয়া কষ্টকর হয়ে পড়ে। অন্যদিকে বোরহানউদ্দিন উপজেলার মনিরাম এলাকা থেকে আসা মাহামুদুল্লাহ রিয়াদ অভিযোগ করেন, হাসপাতালে নিরাপদ খাবার পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। ফলে সামর্থ্যবানরা বাইরে থেকে পানি কিনে আনছেন, আর অনেকে বাধ্য হয়ে বাথরুমের ট্যাপের পানি পান করছেন। তবে হাসপাতাল কম্পাউন্ডে একটি টিউবওয়েল দেখা গেছে। যা শিশু ওয়ার্ড থেকে ৩তলা নীচে। রোগীদের পানি সংগ্রহে নানা দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, শিশু বিশেষজ্ঞ ডা: সালাউদ্দিন আহমেদ শিশু ওয়ার্ডে শিশুদের চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত হাম রোগী ভর্তি থাকায় একটি শয্যায় চার থেকে পাঁচজন শিশুকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। অনেক শিশুকে ওয়ার্ডের বারান্দা মেঝে ও সিড়িতে রেখেও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন রোগীর স্বজনরা। হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের কিছু ফ্যান বন্ধ এবং কিছু ফ্যান অত্যন্ত ধীর গতিতে চলছে। পর্যাপ্ত বাতাস না থাকায় ওয়ার্ড গুলোর মধ্যে ভ্যাপশা গরম অনুভব করা গেছে। ফ্যান থাকা সত্বেও অনেক রোগীর স্বজনকে হাত পাখা দিয়ে বাতাস করতে দেখা গেছে।
হাসপাতালে বর্তমানে শিশু বিশেষজ্ঞ হিসেবে কার্যত একজন চিকিৎসকের ওপরই পুরো বিভাগের দায়িত্ব রয়েছে। হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. সালাউদ্দীন জানান, বহির্বিভাগ ও ভর্তি রোগী মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ শিশুকে চিকিৎসাসেবা দিতে হয়। পাশাপাশি হাম রোগে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসাও একই সঙ্গে চালিয়ে যেতে হচ্ছে। যা একার পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়। তবুও আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরো বলেন, রোগীদেরও সচেতন হওয়া জরুরি। একজন অসুস্থ্য শিশুর সাথে তার পরিবারের সুস্থ্য শিশুরাও থাকছে। এতে করে সুস্থ্য শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) আরাফাতুর রহমান নিজেদের অসহায়ত্ব তুলে ধরে জনবল সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাড়ে ৫০০ রোগী হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন, যার বড় অংশই শিশু। বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ হাজার ৫০০ রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। ২৫ শয্যার শিশু ইউনিটে ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকায় অনেক শিশুকে বারান্দা ও মেঝেতে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, একেকটি বেডে চার থেকে পাঁচটি শিশুকে রাখতে হচ্ছে। চিকিৎসক ও নার্সরা এত রোগীর সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। জরুরি বিভাগে এক মুহূর্তের জন্যও সেবা বন্ধ রাখা যায় না, অথচ প্রয়োজনীয় জনবল নেই। আরএমও আরও জানান, জনবল সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নিয়মিত চিঠি চালাচালি হচ্ছে, এখন পর্যন্ত কার্যকর সমাধান হয়নি। এর জন্য রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে ১০০ শয্যার হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও এখনো পুরোনো ১০০ শয্যার জনবল দিয়েই পরিচালিত হচ্ছে কার্যক্রম। প্রায় সাত বছরেও নতুন জনবল নিয়োগ না হওয়ায় চিকিৎসাসেবায় চাপ বেড়েছে।
হাসপাতাল ও সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তাসহ মোট ১৭৯টি পদের মধ্যে বর্তমানে একচতুর্থাংশ পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে সিনিয়র কনসালট্যান্ট, জুনিয়র কনসালট্যান্ট, মেডিকেল অফিসার, অ্যানেসথেটিস্ট, রেডিওলজিস্ট, প্যাথলজিস্ট ও ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসারের একাধিক পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি। পাশাপাশি নার্সিং ও মিডওয়াইফারিসহ গুরুত্বপূর্ণ বহু পদেও জনবল সংকট রয়েছে।
রোগীর স্বজনদের দাবি, শিশু বিভাগে দ্রুত পর্যাপ্ত চিকিৎসক নিয়োগ, হাসপাতালের পরিবেশ উন্নয়ন, নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নতি নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় চিকিৎসাসেবা আরও ভেঙে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।






